জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় এক নৃশংস হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলেন। তার অকাল প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও ছাত্র-জনতার মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ওসমান হাদির নিজস্ব ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ এবং ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল পেজ থেকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের বার্তায় তাকে ‘মহান বিপ্লবী’ হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়, “ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় ওসমান হাদির আত্মদানকে মহান আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করুন।”
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে লেখেন, “আমাদের ভাই হাদি অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। আবরার ফাহাদ ও আবু সাঈদদের মতো হাদি সশরীরে না থাকলেও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।”
সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হাদির মৃত্যুকে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক এবং আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের অকুতোভয় নেতা ওসমান হাদি শাহাদাৎ বরণ করেছেন। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে তার এই শহীদি আত্মদান মজলুম জনগোষ্ঠীর মুক্তির সংগ্রামে অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকবে।”
শরিফ ওসমান হাদি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরবেলা রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়ক এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি গুলি সরাসরি তার মাথায় বিদ্ধ হলে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিন দিন আইসিইউতে থাকার পর গত ১৫ ডিসেম্বর দুপুরবেলা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ওসমান হাদি ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বৈদেশিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে গঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে সীমান্তের নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যুতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকায় দিনে-দুপুরে একজন উদীয়মান রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করার ঘটনাটি দেশে নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
হাদির মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার নামাজে জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানা গেছে।

