বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিকূলতা এবং বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আন্তর্জাতিক অভিবাসী ও প্রবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত করতে না পারলে এই খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বিশ্বের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি একে ‘সোনার চেয়েও দামি খনি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধান উপদেষ্টার মতে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে অনেক দেশই তরুণ জনশক্তির সংকটে ভুগছে, সেখানে বাংলাদেশ তার অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে বিশ্বদরবারে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
বুধবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয় আন্তর্জাতিক অভিবাসী ও প্রবাসী দিবস। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অভিবাসন খাতের নানা জটিলতা এবং সাধারণ প্রবাসীদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে আমাদের দেশের যে শ্রমশক্তি রপ্তানি হচ্ছে, তার প্রায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই দালালদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এই দুষ্টচক্রের কারণে পদে পদে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে এবং তাদের অর্জিত অর্থ ও স্বপ্ন দুটিই ধূলিসাৎ হচ্ছে। অভিবাসন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত দালালদের যে আধিপত্য, তা সাধারণ শ্রমিকদের জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এই ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও দালালদের প্রভাবমুক্ত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
ভাষণ চলাকালীন প্রধান উপদেষ্টা দেশের তরুণ প্রজন্মের গুরুত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আজ সারাবিশ্বে তরুণ জনশক্তির এক ভয়াবহ অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো যখন কর্মক্ষম মানুষের সংকটে নিমজ্জিত, তখন বাংলাদেশ এক বিশাল তারুণ্যের খনি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই জনশক্তিকে যদি সঠিক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতায় রূপান্তরিত করা যায়, তবে পুরো বিশ্বকে বাংলাদেশের দ্বারস্থ হতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের তরুণদের যে অদম্য মেধা ও শক্তি রয়েছে, তা অন্য কোনো দেশের নেই। তাই এই সম্পদকে অবহেলা না করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে উপস্থাপন করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমেই কেবল প্রবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব পায় প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়টি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, প্রবাসীরা কেবল বিদেশের মাটিতে কাজ করেন না, তারা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ দেশে ফেরার সময় বা বিদেশে অবস্থানকালীন তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন।
এই হয়রানির অবসান ঘটাতে সরকার বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পাসপোর্ট অফিস এবং বিদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীরা যেন প্রাপ্য সম্মান ও সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি মনে করেন, একজন প্রবাসী যখন তার কঠোর পরিশ্রমের টাকা দেশে পাঠান, তখন তাকে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হওয়া উচিত নয়।
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি প্রবাসীদের কল্যাণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেন। তিনি জানান, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সরকার অভিবাসন ব্যয় কমানোর জন্য কাজ করছে।
পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে করে মানুষ ঘরে বসেই অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এতে দালালদের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি সহায়তা এবং বিদেশে জরুরি প্রয়োজনে সহযোগিতার জন্য বিশেষ সেল গঠনের বিষয়টির ওপরও তিনি আলোকপাত করেন।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং অভিবাসী কর্মীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
ড. ইউনূস তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, অভিবাসন প্রক্রিয়া কেবল একজন মানুষের বিদেশে যাওয়া নয়, এটি একটি পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই। সেই লড়াইয়ে সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চায়। তিনি সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন অভিবাসন সংক্রান্ত সেবাগুলো হয়রানিমুক্ত এবং গতিশীল করা হয়।
বক্তব্য শেষে প্রধান উপদেষ্টা দেশের সকল অভিবাসী এবং তাদের পরিবারকে অভিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা জানান। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ একটি সুশৃঙ্খল এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সক্ষম হবে, যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর স্থান থাকবে না।
তারুণ্যের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন। সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং প্রবাসীদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যা ভবিষ্যতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

