৫৪তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ কুচকাওয়াজ ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওস্থ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে আয়োজিত এই মহিমান্বিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ প্রদর্শনী উপভোগ করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত উদ্যোগে এবারের আয়োজনটি ছিল নজিরবিহীন ও আড়ম্বরপূর্ণ।
বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে তেজগাঁও জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে এক মনোজ্ঞ ফ্লাই পাস্ট, রোমাঞ্চকর প্যারাজাম্প এবং বিশেষ অ্যারোবেটিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। আকাশপথে বিমান বাহিনীর এই চৌকস প্রদর্শনী উপস্থিত হাজারো দর্শক ও অতিথিদের মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হিসেবে ছিল সশস্ত্র বাহিনীর একটি সমন্বিত ব্যান্ড দল, যাদের সুনিপুণ বাদ্য পরিবেশনা পুরো এলাকায় এক দেশাত্মবোধক আবহ তৈরি করে। ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল বিশেষভাবে তাদের পারফরম্যান্স তুলে ধরে। রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সেনানিবাস ও ঘাঁটি সংলগ্ন এলাকায় সীমিত আকারে ব্যান্ড দলগুলো কুচকাওয়াজ ও সংগীত পরিবেশন করে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজয়ের আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
এবারের বিজয় দিবসের সবথেকে ঐতিহাসিক দিকটি ছিল গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ প্যারাজাম্পিং ইভেন্ট। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্তিকে সম্মান জানিয়ে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার আকাশ থেকে জাতীয় পতাকাসহ ফ্রি-ফল জাম্পে অংশ নেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে এই রোমাঞ্চকর অভিযানে সশস্ত্র বাহিনীর ৫৩ জন অভিজ্ঞ সদস্য অংশ নেন। আকাশ থেকে পতাকাসহ এই বিপুল সংখ্যক প্যারাট্রুপারের একসাথে অবতরণের ঘটনা এটিই প্রথম। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পতাকাসহ এত বিশাল সংখ্যক মানুষের ফ্রি-ফল জাম্পের রেকর্ডটি এর আগে কোনো দেশের নামে ছিল না।
সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া এই সাহসী উদ্যোগটি যদি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পায়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অনন্য রেকর্ড গড়ার চেষ্টা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও শৌর্য তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের হৃদয়ে জাতীয় গর্ব ও আত্মপরিচয়ের বোধকে নতুন করে জাগ্রত করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি, উপদেষ্টা পরিষদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রধানগণ এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে প্যারেড স্কয়ার হয়ে ওঠে জাতীয় সংহতির এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়কেই বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে ঘোষণা করেছে। দেশের আকাশপথে বিমান বাহিনীর বিশেষ ফ্লাই পাস্ট ঢাকা ছাড়াও খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, নাটোর, বগুড়া, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ীসহ উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষ তাদের নিজ অঞ্চলের আকাশেই এই গৌরবময় ফ্লাই পাস্ট উপভোগ করার সুযোগ পান।
বিজয় দিবসের আনন্দ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সামরিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে নৌবাহিনী ও সামরিক জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ ঢাকার সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালের বিআইডব্লিউটিসি ঘাটে নৌবাহিনীর সুসজ্জিত যুদ্ধজাহাজগুলো সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।
দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাজারো মানুষ এসব জাহাজ পরিদর্শন করে নৌবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। এছাড়া রাজধানীর সামরিক জাদুঘরসহ তিন বাহিনীর অন্যান্য বিশেষায়িত জাদুঘরগুলোও কোনো প্রবেশমূল্য ছাড়াই দিনভর সর্বসাধারণের জন্য খোলা রাখা হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা গভীর আগ্রহের সাথে সামরিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য পর্যবেক্ষণ করেন।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের মহান বিজয় দিবস উদযাপন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল এক নতুন বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের এই আয়োজন এটিই প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের ভাবমূর্তি উন্নয়নে এবং সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
প্যারাজাম্পিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বরেকর্ডের এই প্রচেষ্টা কেবল একটি সংখ্যার বিচার নয়, বরং এটি ৫৪ বছরের গৌরবময় অগ্রযাত্রার একটি সুদৃঢ় প্রতীক। জাতীয় সংগীত ও বিজয়ের স্লোগানে মুখরিত জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের এই আয়োজনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

