রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে চুরি ধরে ফেলায় মা লায়লা আফরোজ এবং তার মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজকে (১৫) হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো সুইচ গিয়ারটিও ছিল চুরি করা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঘাতক গৃহকর্মী আয়েশা এই হত্যাকাণ্ডের আগে একই কায়দায় অন্য একটি বাসা থেকে চাকুটি চুরি করেছিল।
গত ৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় কুপিয়ে এই মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। নিহত লায়লার স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন।
ঘটনার দুই দিন পর ঝালকাঠির নলছিটি এলাকায় আয়েশার স্বামী জামাল শিকদার ওরফে রাব্বি শিকদারের দাদাবাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালত গৃহকর্মী আয়েশার ৬ দিন ও তার স্বামী রাব্বি শিকদারের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড শেষে আদালতে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে আয়েশা।
অন্যদিকে, স্বামী রাব্বি শিকদার আদালতে দাবি করেছেন, তিনি জানতেন তার স্ত্রী সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মচারী। মা-মেয়ে হত্যার পরই তিনি প্রথম জানতে পারেন তার স্ত্রী গৃহকর্মীর কাজ করত এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাব্বি পেশায় নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন।
রাব্বি আদালতে জানান, হত্যার দিন ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি দেখার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন তার স্ত্রী এই ঘটনায় জড়িত। ছুরিকাঘাতের সময়ে ধস্তাধস্তিতে আয়েশার হাত কেটে গিয়েছিল। আহত স্ত্রীকে নিয়ে তিনি প্রথমে হাতের চিকিৎসা করান এবং পরে স্ত্রীকে নিয়ে সদরঘাট চলে আসেন। এই এলাকায় আয়েশার চুরি করে আনা একটি ল্যাপটপ পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে সদরঘাট থেকে লঞ্চে বরিশাল হয়ে তারা ঝালকাঠির নলছিটি এলাকায় আত্মগোপন করেন।
মোহাম্মদপুর থানার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জোড়া হত্যায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ধারালো সুইচ গিয়ারটি ছিল চুরি করা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, “মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের একটি বাসায় একই কায়দায় কাজ নেয় আয়েশা। পরবর্তী সময়ে সেই বাসায় এই চাকুটি পেয়েছিল সে।”
আয়েশা এই চাকু ব্যবহার করে ওই বাসার আলমারির তালা ভেঙে ২০ হাজার টাকা চুরি করেছিল। সেই ঘটনায় পুলিশ তাকে আটক করলেও চুরি করা টাকা ফেরত দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল। যদিও সে সুইচ গিয়ারটি নিজের কাছে রেখে দেয়, যা দিয়ে পরে মা ও মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গৃহকর্মী আয়েশা আসলে একজন ‘পেশাদার চোর’। সে বিভিন্ন বাসায় কাজ নিয়ে প্রবেশ করে চুরি করত। ২০২৪ সাল থেকে গত ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সে অন্তত পাঁচটি বাসায় চুরি করেছে। এমনকি তার বোনের বাসা থেকেও নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি করেছিল। চুরির সুবিধার্থে সাভারে পরিবার থাকা সত্ত্বেও সে জেনেভা ক্যাম্পে ভাড়া থাকত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ওসমান মাসুম জানান, ঘটনার দিন বাসা থেকে দুটি ল্যাপটপ, একটি স্মার্টফোন, একটি বাটন ফোন, এক জোড়া চুড়ি ও একটি গলার চেইন চুরি হয়। হত্যা করার পর আয়েশা নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ নিয়ে বের হয়েছিল। ঘটনা জানাজানি হলে আয়েশার স্বামী মোবাইল, স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ ভর্তি করে নদীতে ফেলে দেন, যা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে সদরঘাট এলাকায় বিক্রি করা ল্যাপটপটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার অভিযানে আসামিদের কাছ থেকে এক জোড়া চুড়ি ও চেইন উদ্ধার করা হয়েছে।
এসআই মাসুম আশা প্রকাশ করেন, রিমান্ডে থাকা প্রধান আসামি আয়েশা প্রাথমিকভাবে হত্যার কথা স্বীকার করায়, সে আদালতে একই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে।

