বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা ইউনিয়নের সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটি সেদিন সকাল থেকেই এক অন্যরকম ব্যস্ততায় মুখর ছিল। উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র ও বয়োবৃদ্ধ মানুষের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছিল মাঠজুড়ে।
বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন শিবিরের এই মানবিক আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। চোখের আলো ফেরানোর এই মহৎ উদ্যোগের ভিড়েই হঠাৎ রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের বাতাসে।
চিকিৎসা শিবিরের আনুষ্ঠানিকতার মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার পর থেকেই প্রতিমন্ত্রীর সুরে চলে আসে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে শুরু করেন তিনি।
তার সেই বক্তব্যে সরাসরি নিশানায় ছিল জামায়াত ইসলামীর রাজনীতি ও তাদের বিগত দিনের কার্যক্রম। উপস্থিত সাধারণ মানুষের সামনে তিনি তুলে ধরেন মাঠের রাজনীতির কিছু কড়া বাস্তবতা ও অনুভবের কথা।
মীর শাহে আলম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন যে, ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি সাধারণ মানুষের বিপদে কখনোই পাশে দাঁড়ায় না। তাদের পুরো কার্যক্রম কেবল নিজেদের রাজনৈতিক বলয় আর দলীয় কর্মী সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জামায়াত নিজেদের দলীয় গণ্ডির বাইরে সাধারণ কোনো মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না। এমনকি সমাজের অত্যন্ত প্রান্তিক ও সহায়হীন একজন ফকিরকেও তারা নিজস্ব কর্মী ছাড়া কোনো ধরনের সহায়তা বা ভিক্ষা দেয় না।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ধর্মের আবেগকে হাতিয়ার করার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ভোটের আগে সাধারণ মানুষকে বেহেশতের লোভ দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে রায় আদায় করে নিয়েছে দলটি। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর মানুষের দুখে-দুর্দশায় তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ধর্মীয় রাজনীতির দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপূজার ঠিক আগে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে নানা রাজনৈতিক কথা বলা হলেও উৎসবের দিনগুলোতে তাদের খোঁজ নিতে কাউকে পাওয়া যায়নি। তারা কেবল নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করে যায়।
অথচ মাঠের প্রকৃত ইসলাম প্রচারক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে জড়িত সাধারণ মানুষদের কল্যাণ নিয়ে তাদের মুখে কোনো কথা থাকে না। সমাজের অবহেলিত ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জীবনমান উন্নয়নে তারা কখনো কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর বিপরীতে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, আপনাদের সন্তান ও নেতা তারেক রহমান দেশের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ও বেতনের স্থায়ী ব্যবস্থা করেছেন। সরকারের নীতিমালায় সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
বিগত দিনের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও বিতর্কিত ভোটগ্রহণের প্রসঙ্গ টেনেও স্পষ্ট বার্তা দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল কোনো ধরনের ‘আমি-ডামি’ বা পাতানো নির্বাচনে বিশ্বাস করে না।
ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট কোনো পথ বা কৃত্রিম কৌশল দল কখনো গ্রহণ করবে না বলে জানান তিনি। জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট ও ভালোবাসা অর্জন করেই পাঁচ বছর পর আবার ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরতে চায় বর্তমান সরকার।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোর কথা উল্লেখ করেন মীর শাহে আলম। তিনি জানান, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের চার কোটি পরিবারকে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলো নিয়মিত সরকারি সহায়তা ও সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনমান বদলে দিতে এই প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখবে।
চিকিৎসা শিবিরের এই মঞ্চ থেকে দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর এসব বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে উত্তর জনপদের রাজনৈতিক মহলে। একদিকে চোখের আলো ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে রাজনৈতিক কথার লড়াই—সব মিলিয়ে মোকামতলার পরিবেশ বেশ চঞ্চল হয়ে ওঠে।
উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে এমন সরাসরি আক্রমণ ও পাল্টা জবাবের ধারা নতুন নয়, তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর এই ধরনের বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নগুলো এখন মাঠের রাজনীতিতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সেই বিশাল জনসমাগম এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় এক অন্যরকম বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে রইল। চোখের ছানি অপারেশন শেষে ফিরে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে আলোর ঝলকানি যেমন ছিল, তেমনি কানজুড়ে ছিল রাজনৈতিক বক্তৃতার রেশ।
দিনভর চলা এই চিকিৎসা শিবির ও রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে বগুড়ার স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। সরকারের মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতাদের এমন সরাসরি মূল্যায়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটুকু মাঠে গড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

