জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চিত্রও তুলে ধরেন। তাঁর এই ভাষণটি ছিল মূলত বিশ্বশান্তি, মানবিকতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক জোরালো আহ্বান।
বাংলাদেশ সময় রাত ৪টা ১৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় তাঁর ভাষণ শুরু করেন। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি একটি বিরল ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার গৌরব অর্জন করলেন। এর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট তাঁর পিতা এবং বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম অধিবেশনে তাঁর মা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কে তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপরই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের কথা তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। জুলাই-আগস্টের সেই বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, বিশ্বমঞ্চ থেকে তিনি তাদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানান। তাঁর মতে, এই দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ ধরেই বাংলাদেশ বর্তমানে একটি নতুন শ্বাস নিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
জনগণই যে সব রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস, সে কথা দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের এই গণতন্ত্রকামী মানুষকে তিনি অভিবাদন জানান, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের পিতা ও মাতার ভাষণের কথা স্মরণ করে তিনি কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তাঁর পিতা ও মাতা যেভাবে দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলেছিলেন, আজ তিনিও ঠিক একইভাবে একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছেন।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়েও তিনি বিশদ আলোচনা করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি পড়ে। মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে আজ অনেক দেশে যে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে তীব্র চাপের মুখে ফেলছে। বিশাল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে অবনতির দিকে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সংঘাতের সমাধান যে কেবল আলোচনা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে বলে তিনি জানান। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক সম্মান রক্ষাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ প্রত্যাশা করেন যেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং কূটনীতি, শিক্ষা এবং মানবতাই হবে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার। জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার যে প্রবণতা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, তা বিশ্বশান্তির পথে একটি বড় অন্তরায়। একটি শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং সাধারণ নিরস্ত্রীকরণের প্রতি পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি বিশ্বনেতাদের আশ্বস্ত করেন। ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের ওপর চলমান আগ্রাসনের বিষয়েও তিনি বাংলাদেশের স্পষ্ট ও জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন।
ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ যে টেকসই শান্তি ও সংঘাত প্রতিরোধের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে, সে কথাও তিনি তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি জানান, দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ, পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা আর বেশি দিন বহন করা সম্ভব নয়। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত রয়েছে।
বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ও সসম্মানে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করেন। একইসঙ্গে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জরুরি আহ্বান জানান তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাবের শিকার হচ্ছে, সে বিষয়টি তিনি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে বলে তিনি জানান।
পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া নিজস্ব উদ্যোগগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর একটি বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্লিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ওপর সরকার সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। দেশকে বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর কথাও ভাষণে উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী জানান, পানিসম্পদ সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন ব্যবস্থায় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিও তিনি জোর দেন। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সরকার ১৯৯২ সালের আন্তর্জাতিক ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে বলে তিনি বিশ্বনেতাদের অবহিত করেন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী থ্রি-আর (3-R) কৌশলের কথা উল্লেখ করেন। রিকভারি, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন—এই তিন নীতির ওপর ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত একটি দেশকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বিগত বছরগুলোতে গুম, খুন, দুর্নীতি এবং টাকা পাচারের মতো যেসব অপরাধ স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল, সেসব অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এখন সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে বলে তিনি দাবি করেন।
দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার সরকারি পরিকল্পনার কথা তিনি বিশদভাবে তুলে ধরেন। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম প্রধান ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের উৎসাহ দিতে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ স্টার্টআপ তহবিল গঠনের কথাও তিনি জানান।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের নেওয়া যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোও জাতিসংঘের মঞ্চে প্রশংসিত হওয়ার মতো। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী, তাই আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে নারীদের সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে সহজ শর্তে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের জন্য সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে চায় বর্তমান সরকার। সেই লক্ষ্যেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বহুমুখী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে, প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করাকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। ভবিষ্যতে এই কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও তিনি প্রকাশ করেন।
শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে জিডিপির হার ৫ শতাংশে উন্নীত করার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা সরকারের রয়েছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম এবং দুপুরের খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্কুলে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান বিকাশের এই যুগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়েও তিনি কথা বলেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করলেও এর সুযোগ যেন সবার জন্য সমান থাকে, সেদিকে তিনি জোর দেন। বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে তিনি উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
পরিশেষে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের অপেক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন এবং বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার ওপর তিনি জোর দেন। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন। “সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ”—এই স্লোগান উচ্চারণ করে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সব নীতির প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

