জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের পর দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে উষ্ণ অভিনন্দন ভেসে এসেছে। নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই ভাষণকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দিকনির্দেশনামূলক বলে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শুক্রবার বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক বিশেষ বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ব দরবারে দেশের মর্যাদা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী বক্তব্য বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও মজবুত করবে। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক ভাষণ ছিল না, বরং তা ছিল দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আকাঙ্ক্ষারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর অভিনন্দনবার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী কীভাবে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোকে একই সুতোয় গেঁথেছেন। এক বৈরী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভাবমূর্তিকে বহুগুণ উজ্জ্বল করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিউইয়র্কের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তরের এক বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেন। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশে যেভাবে গণতন্ত্র ও সুশাসন ফিরে এসেছে, তা বিশ্ববাসীর সামনে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের বার্তাটি বিশ্বনেতাদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছে গেছে।
রাষ্ট্রপতির মতে, এই ভাষণটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার এক নিখুঁত রূপরেখা। গুম, খুন এবং সীমাহীন আর্থিক দুর্নীতির তিমির পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন পূর্ণ গণতান্ত্রিক সুশাসনের পথে হাঁটছে। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহিতাই বর্তমান সরকারের পরিচালনার মূল ভিত্তি।
দেশের ধসে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকার যে বিশেষ ‘থ্রি-আর’ (3-R) কৌশল গ্রহণ করেছে, ভাষণে তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ ছিল। রিকভারি, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার এই নীতিকে প্রশংসনীয় বলে মনে করছেন বঙ্গভবন। বিশ্বমঞ্চে এই কৌশল তুলে ধরে উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণের যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তাও অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।
শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, বিশ্বশান্তি ও বহুপাক্ষিকতার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর জোরালো বক্তব্য নজর কেড়েছে সবার। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং সাধারণ নিরস্ত্রীকরণের যে আহ্বান বাংলাদেশ জানিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের শান্তিপ্রিয় নীতিকেই ফের প্রমাণ করল। যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনা ও কূটনীতিই যে সংকটের একমাত্র সমাধান, সেই চিরন্তন সত্যটিই পুনরুল্লিখিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ছিল আপসহীন। স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে তাঁর এই সোচ্চার দাবি বিশ্বের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বিশ্বনেতাদের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টিও তিনি জোরালোভাবে উগড়ে দিয়েছেন।
রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়। মিয়ানমারের এই বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই যে একমাত্র স্থায়ী সমাধান, তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের নৈতিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক প্রচেষ্টার কথা ভাষণে স্থান পায়। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে যে অসামান্য খেসারত দিতে হচ্ছে, সে বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর যৌক্তিক দাবি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
অভ্যন্তরীণ পর্যায় পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির কথা তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বমানের ওয়াটার কনভেনশনে বাংলাদেশের সাক্ষরের বিষয়টিও বিশ্বনেতারা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় একটি উন্নয়নশীল দেশের এমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সত্যিই বিরল।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সংকটময় সময়টিকে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে যে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।
উন্নয়নমূলক খাত থেকে বাজেট কেটে নিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিশ্বে চলছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সমতা, ন্যায্যতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান না থাকলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে, কারও জন্য সমৃদ্ধি আনে না।
বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক মঞ্চ হিসেবে না দেখে, ‘একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারপ্রধান। সংঘাতময় বিশ্বে যুক্তি, শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি তাকে মানবজাতির জন্য এক নতুন আলোর পথ হিসেবে দেখছেন।
দেশের তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মধ্যেও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। স্টার্টআপ উদ্যোগের জন্য কোটি কোটি টাকার তহবিল এবং শিল্প খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শিল্প কেন্দ্রে পরিণত করবে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে প্রযুক্তিকে সবার নাগালের মধ্যে আনার আহ্বানও জানানো হয়।
নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বিশ্বমঞ্চে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ এবং স্নাতক পর্যন্ত বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ নারী সমাজকে আত্মনির্ভরশীল করবে। রাষ্ট্রপতি মনে করেন, এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ননীতি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করেছিলেন এক অনন্য প্রত্যয় দিয়ে—‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই মূলমন্ত্রের প্রশংসা করে বলেন, এর মধ্য দিয়েই দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা ফুটে ওঠে। একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের এই স্বপ্ন প্রতিটি নাগরিককে অনুপ্রাণিত করবে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ভাষণটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। একই পরিবারের তিন তিনটি প্রজন্মের সদস্য কর্তৃক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বে অত্যন্ত বিরল। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক অবিস্মরণীয় নজির গড়ে তুলল।
স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম পরিবারের সদস্য হিসেবে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। এরপর ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আজ তারই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করলেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই গৌরবময় মুহূর্তকে পুরো জাতির অর্জনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি পরিবারের দেশের সেবায় নিয়োজিত থাকা এবং বিশ্ব দরবারে প্রতিনিধিত্ব করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশকে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দিল।
এক বার্তায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য এবং নিউইয়র্কের এই সফল সফর শেষ করে দেশে নিরাপদে ফিরে আসার কামনা করেন। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের এই ঐতিহাসিক ভাষণটি আগামীর বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল, মানবিক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে পুরো দেশ আশা রাখছে।

