দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের একটি ছোট অংশে সামান্য মেরামতের কাজও তৈরি করতে পারে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। শুক্রবার দুপুরের দিকে যারা এই পথে যাতায়াতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
আজ, ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মহাসড়কের দাউদকান্দি সংলগ্ন আলিপুরা সেতুর ঢাকামুখী লেনে চলবে জরুরি মেরামতকাজ। দুপুর ১টা থেকে বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত টানা দেড় ঘণ্টা এই সংস্কার কাজ চলবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ওই নির্দিষ্ট সময়ে সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচলে বড় ধরনের ধীরগতি তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দাউদকান্দি সেতু পার হওয়ার পরপরই চালকরা এই ধীরগতির মুখে পড়বেন। মেরামতকাজ চলাকালীন শ্রমিক ও যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে যানবাহনের গতিসীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা হবে। তাই শুক্রবারের এই ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে সড়কে বের হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম এই সংস্কার কাজের বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সেতুর কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেই এই স্বল্প সময়ের মেরামতকাজটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে ছুটির দিনের কথা বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপির স্টাফ অফিসার তারিক লতিফও একটি বিশেষ বার্তার মাধ্যমে পরিবহন মালিক, চালক ও সাধারণ যাত্রীদের আগাম সতর্ক করেছেন। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং সঠিক তথ্য দ্রুততম সময়ে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সব মহলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শুধু দুটি বড় শহরের সংযোগস্থল নয়, এটি দেশের প্রধান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মূল ধমনি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হওয়া শত শত ভারী কন্টেইনারবাহী লরি প্রতিদিন এই পথ ধরে রাজধানীতে প্রবেশ করে। তাই এই সড়কের যেকোনো যানজট সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইনের ওপর।
আলিপুরা সেতুর মতো পুরোনো অবকাঠামোগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। বছরের পর বছর ধরে ভারী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে এই সেতুগুলোর জয়েন্ট ও স্ল্যাবে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়। বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত বিপর্যয় বা প্রাণহানি এড়াতেই সড়ক ও জনপথ বিভাগ নিয়মিত বিরতিতে এমন সংস্কার কাজ পরিচালনা করে থাকে।
তবে সংস্কার কাজের সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবহন চালকদের মধ্যে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর মহাসড়কে গাড়ির চাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়ে। এই সময়ে মেরামতকাজ চললে দাউদকান্দি টোল প্লাজা ছাড়িয়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হতে পারে, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য চরম দুর্ভোগ ডেকে আনবে।
কর্তৃপক্ষ অবশ্য যাত্রীদের আশ্বস্ত করেছে যে, যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য হাইওয়ে পুলিশের একাধিক চৌকস টিম মাঠে সরাসরি মোতায়েন থাকবে। বিকল্প লেনে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে। তারপরও ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতির উপস্থিতির কারণে গাড়ির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়াটা আজ একেবারেই অনিবার্য।
যেকোনো হাইওয়েতে একবার যানজট শুরু হলে তা খুব দ্রুত পেছনে থাকা অন্যান্য যানবাহনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মাত্র দেড় ঘণ্টার এই মেরামতকাজের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলোর সিডিউলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেওয়ার শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অতীতেও দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সামান্য কোনো কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হলে মেঘনা ও গোমতী সেতু পর্যন্ত গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় চালকদের অসীম ধৈর্য ধারণ করার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রয়োজন। অস্থির হয়ে ওভারটেকিং করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কের যেকোনো সংস্কার কাজের আগে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইন এবং ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড ব্যবহার করা উচিত। কাজ চলার স্থানের অন্তত দুই কিলোমিটার আগে থেকেই চালকদের গতি কমানোর সংকেত দেওয়া হলে আকস্মিক দুর্ঘটনা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। হাইওয়ে পুলিশ এই বৈশ্বিক নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনেই আজকের কাজটি পরিচালনা করবে।
সাধারণ যাত্রীদের প্রতি বিনীত পরামর্শ হলো, তারা যেন যাত্রার আগে হাইওয়ে পুলিশের কন্ট্রোল রুম অথবা রেডিও চ্যানেলগুলো থেকে বর্তমান ট্রাফিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য জেনে নেন। প্রয়োজনে বিকালের দিকে যাত্রা শুরু করলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ও সড়কের ধুলোবালি থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
আলিপুরা সেতুর ঢাকামুখী লেনে কাজের সময় বিপরীত দিকের লেনে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে। ট্রাফিক পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, চট্টগ্রামমুখী লেনে আজ কোনো মেরামতকাজ হচ্ছে না, তাই ওই লেনে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকবে। তবে এক লেনের জটলার প্রভাব অন্য লেনেও কিছুটা পড়তে পারে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ফোর লেনে উন্নীত হওয়ার পর থেকে এই পথে যাতায়াতের সময় আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু সেতুগুলোর টোল প্লাজা ও সরু সংযোগ সড়কগুলোতে এখনো কিছুটা গাড়ির জটলা দেখা যায়। বিশেষ করে দাউদকান্দি ও মেঘনা সেতু এলাকায় ছুটির দিনে অতিরিক্ত গাড়ির চাপে চালকদের প্রায়শই দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে থাকতে হয়।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা হাইওয়ে পুলিশের এই আগাম সতর্কবার্তাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আগে থেকে সঠিক তথ্য জানা থাকলে বাস চালকদের রুট পরিবর্তন বা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে অনেক সুবিধা হয়। যাত্রীদেরও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা যায়, যাতে তারা যানজটে আটকা পড়লেও বাস স্টাফদের ওপর উত্তেজিত না হন।
দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসনে একটি ডেডিকেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে সেই বিশাল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত বর্তমান সড়কটির সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণই সবার একমাত্র ভরসা। আলিপুরা সেতুর আজকের মেরামতকাজ সেই বৃহত্তর রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ারই একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যানবাহনের চালকদের প্রতি বিশেষ ও কঠোর নির্দেশনা হলো, তারা যেন কোনোভাবেই আজ রং সাইড বা উল্টো পথ দিয়ে গাড়ি চালানোর অপচেষ্টা না করেন। যানজটে আটকা পড়ে অধৈর্য হয়ে অনেকেই বিপরীত লেন দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা পরবর্তীতে ডেডলক বা ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি করে। হাইওয়ে পুলিশ এ বিষয়ে আজ বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না।
অতিরিক্ত আইজিপির দপ্তর থেকে পাঠানো বার্তায় অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলা হয়েছে, মহাসড়কে আজ শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো পরিবহন যদি ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা অমান্য করে অযথা জটলা পাকানোর চেষ্টা করে, তবে তাদের মামলা দেওয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে।
দুপুরের এই মেরামতকাজের সময় জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন, যেমন অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা মাঠে থেকে নিশ্চিত করবেন যেন কোনো মুমূর্ষু রোগী যানজটে আটকে থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন না হন।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও এই মেরামতকাজের সময় পুলিশকে সার্বিক সহায়তা করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। দাউদকান্দি এলাকার স্থানীয় বাজার ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে যাতে অবৈধ পার্কিং করে মহাসড়ক সরু না করা হয়, সেদিকে হাইওয়ে পেট্রোল টিম বিশেষ নজর রাখছে। সড়কের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা আজ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা একান্ত প্রয়োজন।
প্রচণ্ড গরমে মহাসড়কে দীর্ঘক্ষণ বাসের ভেতরে আটকে থাকলে শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি শারীরিক কষ্ট হয়। তাই আজ যারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করবেন, তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ওষুধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি বা বিপদের প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে হাইওয়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক সহায়তা নেওয়া যাবে।
সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, আলিপুরা সেতুর এই মেরামতে খুব বেশি সময় নষ্ট হবে না। দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং টেকসই হয় এমন বিশেষ রাসায়নিক ও উন্নতমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। দেড় ঘণ্টার মধ্যে মূল ঢালাইয়ের কাজ শেষ হলেও, পরবর্তী আধা ঘণ্টা সময় লাগবে রাস্তা পুরোপুরি পরিষ্কার করে নিরাপদ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে।
এই ধরনের জরুরি মেরামত কাজ সাধারণত রাতের বেলায় করার একটি জোরালো দাবি থাকে সাধারণ মানুষের তরফ থেকে। তবে সড়ক বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট কাঠামোগত কাজের জন্য দিনের বেলার পর্যাপ্ত আলো ও শুষ্ক আবহাওয়া একেবারে অপরিহার্য। কাজের সর্বোচ্চ মান ও দীর্ঘস্থায়ীত্ব বজায় রাখতেই আজ শুক্রবার দুপুরের সময়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের এই আগাম জরুরি বার্তাটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক ট্রাফিক গ্রুপ ও অন্যান্য মাধ্যমে সচেতন চালক ও যাত্রীরা এই তথ্যটি শেয়ার করে একে অপরকে সতর্ক করছেন। পুলিশের এমন জনবান্ধব ও প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকার প্রশংসা করেছেন সাধারণ নেটিজেনরা।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আজকের পরিস্থিতি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের জন্য একটি সাময়িক পরীক্ষার মতো। ট্রাক চালক, বাসের যাত্রী এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ—সবার সম্মিলিত ধৈর্য, সচেতনতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই সাময়িক অসুবিধা এড়িয়ে একটি নিরাপদ মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবশেষে, আজ দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই পথ দিয়ে চলাচলকারী সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা আপনাদের আজকের যাত্রাটি এই মেরামতকাজের সময়সূচি মাথায় রেখে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করুন। আপনার সামান্য সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি পুরো ভ্রমণকে করতে পারে আরামদায়ক এবং যানজটের অপ্রত্যাশিত শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

