যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখা বহু বাংলাদেশির জন্য এক দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পর্যটন, ব্যবসা বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমান। এই ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম হলো বি১/বি২ ভিজিটর ভিসা। কিন্তু সম্প্রতি এই ভিসার শর্ত লঙ্ঘন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।
শনিবার নিজেদের দাপ্তরিক ফেসবুক পেজে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় দূতাবাস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, এই নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যথেচ্ছ কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানোর সুযোগ নেই। একটি দেশের অভিবাসন আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থাকার বাধ্যবাধকতা সবার জন্যই প্রযোজ্য। ভিসার শর্ত ভেঙে কোনো অননুমোদিত কাজে যুক্ত হলে তা মারাত্মক আইনি পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মূলত, বি১ ভিসা দেওয়া হয় স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক কাজের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে কোনো ব্যবসায়িক সম্মেলনে যোগ দেওয়া, চুক্তি স্বাক্ষর করা বা পেশাদার কোনো সেমিনারে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে, বি২ ভিসা দেওয়া হয় খাঁটি পর্যটন, ছুটি কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসাসেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে। এই দুটি ভিসা সাধারণত একসঙ্গে বি১/বি২ হিসেবে ইস্যু করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভ্রমণকারীরা সেখানে স্থায়ী বাসিন্দাদের মতো সব সুবিধা ভোগ করবেন।
মার্কিন দূতাবাস তাদের বার্তায় এই ভিসার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারা মনে করিয়ে দিয়েছে, ভিজিটর ভিসা কোনোভাবেই অভিবাসনের বিকল্প পথ নয়। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অতিথি হিসেবে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতিপত্র মাত্র। এই অনুমতির অপব্যবহার করলে কেবল ব্যক্তির নিজেরই ক্ষতি হবে না, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় সন্তান জন্মদান
মার্কিন দূতাবাসের এই সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ বন্ধ করা। বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেরও কিছু মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। গর্ভবতী নারীরা ভিজিটর ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান, যাতে তাদের অনাগত সন্তান জন্মের পরপরই মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে।
দূতাবাস দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, শিশুর মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া বি১/বি২ ভিজিটর ভিসার আওতায় কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়। এই ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভিসা আবেদন করা বা দেশটিতে প্রবেশ করা মার্কিন ইমিগ্রেশন আইনে সরাসরি জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হয়। কনস্যুলার অফিসাররা এখন এই বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক এবং কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় যদি কোনো আবেদনকারী তার সন্তান জন্মদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেন, তবে তার ভিসা চিরতরে বাতিল হতে পারে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তি বা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপরও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নেমে আসতে পারে। মার্কিন প্রশাসন মনে করে, এই ধরনের চর্চা তাদের করদাতাদের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো গর্ভবতী নারী ভিজিটর ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না। যদি ভ্রমণের উদ্দেশ্য সত্যিই পর্যটন বা আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সব ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা থাকে, তবে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু নাগরিকত্ব লাভের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে যাওয়াটা এখন সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অননুমোদিত কর্মসংস্থান
মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল ভিজিটর ভিসায় কাজ করার প্রবণতা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর অনেকেই স্থানীয় কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়ের দোকান বা অন্য কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, নগদ অর্থে বা ক্যাশে পারিশ্রমিক নিলে হয়তো তা প্রশাসনের নজরে আসবে না।
দূতাবাস অত্যন্ত কঠোরভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিয়োগকর্তা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়—এমন কোনো কাজ এই ভিসায় করা সম্পূর্ণ বেআইনি। একজন ভিজিটর হিসেবে আপনি কোনোভাবেই স্থানীয় শ্রমবাজারের অংশ হতে পারবেন না। ভিজিটর ভিসাধারীদের জন্য কাজ করার কোনো আইনি অনুমতি বা ‘ওয়ার্ক পারমিট’ থাকে না।
অনেকেই না বুঝে আত্মীয়দের পেট্রোল পাম্প, রেস্তোরাঁ বা মোটেলে কাজ করে দেন এবং বিনিময়ে কিছু অর্থ গ্রহণ করেন। মার্কিন আইনে এটিও সরাসরি ভিসা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। এমনকি কোনো মার্কিন কোম্পানির হয়ে ফ্রিল্যান্সিং বা চুক্তিভিত্তিক কাজ করে পারিশ্রমিক নেওয়াও এই ভিসার শর্তের পরিপন্থি। মার্কিন শ্রম আইন দেশি কর্মীদের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর এবং বিদেশি দর্শনার্থীদের মাধ্যমে সেই বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে তারা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয় না।
যদি কোনো ভিজিটর অবৈধভাবে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েন, তবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এরপর ইমিগ্রেশন আদালতের মাধ্যমে তাকে নিজ দেশে ফেরত বা ডিপোর্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একবার ডিপোর্ট হলে সেই ব্যক্তির জন্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কোনোভাবেই নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করার পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা এবং ক্রেডিটের সীমাবদ্ধতা
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ভিজিটর ভিসার নির্দিষ্ট কিছু কড়াকড়ি রয়েছে, যা মার্কিন দূতাবাস তাদের বার্তায় তুলে ধরেছে। অনেকেই মনে করেন, ভিজিটর ভিসায় গিয়ে কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিস্টার বা ছোট কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আইনি দিক থেকে অত্যন্ত জটিল।
দূতাবাস স্পষ্ট করেছে, ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেডিট অর্জনের জন্য পড়াশোনা করা বি১/বি২ ভিসার আওতায় কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়। আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কোনো হাইস্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট স্টুডেন্ট ভিসা (যেমন- এফ১ বা এম১) সংগ্রহ করতে হবে। ভিজিটর ভিসা নিয়ে কোনো একাডেমিক প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
অবশ্য এর কিছু ছোট ব্যতিক্রম রয়েছে। কোনো দর্শনার্থী চাইলে ছোটখাটো বিনোদনমূলক কোর্সে অংশ নিতে পারেন, যা কোনো একাডেমিক ক্রেডিট বা ডিগ্রির অংশ নয়। উদাহরণস্বরূপ, দুই দিনের একটি কুকিং ক্লাস বা পর্যটকদের জন্য আয়োজিত কোনো ছোট কর্মশালায় অংশ নিতে বাধা নেই। তবে যে পড়াশোনার মূল লক্ষ্য একটি সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি অর্জন, তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার একটি নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে ভিজিটর ভিসাকে শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। বর্ডার কন্ট্রোল অফিসাররা যদি বুঝতে পারেন যে, আপনার মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা, তবে তারা বিমানবন্দর থেকেই আপনাকে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারেন।
প্রবেশ বন্দরে কঠোর তল্লাশি এবং জবাবদিহিতা
ভিসা পেলেই যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের শতভাগ নিশ্চয়তা পাওয়া গেল, বিষয়টি এমন নয়। মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) অফিসারদের যেকোনো দর্শনার্থীকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানোর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। মার্কিন দূতাবাস এই বিষয়টি পরোক্ষভাবে তাদের সতর্কবার্তায় মনে করিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রবেশ বন্দরে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশন অফিসাররা দর্শনার্থীদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য, থাকার জায়গা এবং ফিরে যাওয়ার টিকিট সম্পর্কে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যদি তাদের মনে সামান্যতম সন্দেহ হয় যে দর্শনার্থী ভিজিটর ভিসার শর্ত ভেঙে কাজ করবেন, পড়াশোনা করবেন বা সন্তান জন্ম দেবেন, তবে তারা দর্শনার্থীকে ‘সেকেন্ডারি ইন্সপেকশন’ বা অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান।
এই প্রক্রিয়ায় দর্শনার্থীর মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তাগুলোও তল্লাশি করা হতে পারে। যদি সেখানে অবৈধভাবে কাজ খোঁজার বা দীর্ঘমেয়াদে থেকে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে ভিসা বাতিল করে ওই দিনই পরবর্তী ফ্লাইটে দর্শনার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই ধরনের পরিস্থিতি চরম অপমানজনক এবং মানসিক যন্ত্রণার কারণ হতে পারে।
তাই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে শতভাগ সততা বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। ভিসার সাক্ষাৎকারে যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে, প্রবেশের সময়ও ঠিক একই উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য বা লুকোচুরি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আইনি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রকৃত ভ্রমণকারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
কতিপয় মানুষের এই ভিসা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সাধারণ এবং সৎ দর্শনার্থীদের জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। যখন বেশি সংখ্যক মানুষ ভিজিটর ভিসায় গিয়ে অবৈধ কাজ বা বার্থ ট্যুরিজমে জড়িয়ে পড়েন, তখন মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে পুরো দেশের পাসপোর্টধারীদের নিয়েই একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
এর ফলে যারা সত্যিই পর্যটনের জন্য বা অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যেতে চান, তাদের ভিসা পাওয়ার পথটিও অনেক কঠিন হয়ে যায়। কনস্যুলার অফিসাররা ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং অনেক সময় সঠিক উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকের ভিসা আবেদন বাতিল হয়ে যায়। একটি মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর ভুলের মাশুল গুনতে হয় হাজারো সাধারণ নাগরিককে।
মার্কিন দূতাবাসের এই সতর্কবার্তাটি তাই কেবল একটি সাধারণ ঘোষণা নয়, এটি একটি জোরালো সতর্কঘণ্টা। তারা পরিষ্কার বার্তা দিতে চাইছে যে, অভিবাসন আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পাওয়ার দিন শেষ। আধুনিক প্রযুক্তি এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর।
বাংলাদেশি নাগরিকদের উচিত এই সতর্কবার্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। অন্য একটি দেশের আইন ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বৈধ উপায়ে ভ্রমণ করলে তা দুই দেশের সম্পর্ককেও আরও মজবুত করে। ভিসার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা সম্ভব।

