দেশের আর্থিক খাতের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রবিন্দুতেই নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি। প্রতিনিয়ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নজরদারি করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকার সাইবার অপরাধ, অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ে জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
এই গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বা প্রশাসনিক বিভাগের সহকারী পরিচালক রকিবুল হাসান খান রকি। রাষ্ট্রীয় এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ এক জরুরি আদেশ জারির মাধ্যমে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ঘটনাটি কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, রূপ নিয়েছে রোমাঞ্চকর এক পুলিশি অভিযানে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্চিত তথ্য ও সোর্সের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সরাসরি অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গোয়েন্দা দলের এই আকস্মিক উপস্থিতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চত্বরে চাঞ্চল্য তৈরি করে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পৌঁছানোর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগেই গোপন খবরে সতর্ক হয়ে যান অভিযুক্ত কর্মকর্তা।
আইনশৃঙ্খলার চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে প্রধান কার্যালয়ের সীমানা টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন রকিবুল হাসান। সেই থমথমে মুহূর্তের পর থেকে তিনি গা ঢাকা দিয়ে আছেন। পুলিশের বিশেষ দলগুলো ঢাকার ভেতরে ও বাইরে একাধিক স্থানে অভিযান চালালেও এখনো তাঁকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পলাতক এই কর্মকর্তার সম্ভাব্য গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ।
অভ্যন্তরীণ নোটিশ ও প্রশাসনিক আইনি কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ ও নীতি নির্ধারণী বিভাগের এক অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর চাকরিবিধি অনুসরণ করেই তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস, ২০০৩-এর ৪৫(৫) ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত রকিবুলকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বরখাস্ত কার্যকর থাকা অবস্থায় তিনি বিধিমোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসনিক নির্দেশিকা, ২০০৩-এর ২১(ক) ধারা অনুযায়ী কেবল খোরপোষ বা জীবিকা ভাতা পাবেন। কোনো ধরনের দায়িত্ব পালন বা ব্যাংকিং কার্যক্রমে তাঁর প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই নোটিশ জারির পর থেকেই আদেশটি কার্যকর হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের মুখপাত্রদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বিষয়টির গুরুত্ব নিশ্চিত করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল মেনে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো কর্মকর্তা আইনগত বা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হলে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও অফিসিয়াল মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গোটা বিষয়ে গণমাধ্যমের সামনে ব্যাংকের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সাইবার অপরাধ, অনলাইন বেটিং এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী অর্থ লেনদেনের প্রমাণ মিলছে। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে।”
মুখপাত্র আরও নিশ্চিত করেন যে, যেকোনো সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা বা তদন্ত শুরু হলে তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের অধীনে নেওয়া বাধ্যতামূলক। এতে তদন্ত নিরপেক্ষ হয়। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে এই বরখাস্ত প্রত্যাহার করার বিধান রয়েছে, কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হলে চূড়ান্ত বরখাস্ত ও আইনি শাস্তি মিলবে।
গোয়েন্দা পুলিশের আকস্মিক সিসিটিভি ও গোপন তথ্য যাচাই
ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলামের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় একটি বিশেষ দল গত সপ্তাহে মতিঝিলস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে অনুপ্রবেশ করে। গোয়েন্দা বিভাগের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল যে অভিযুক্ত কর্মকর্তা রকিবুল নিজের দপ্তরেই অবস্থান করছেন। ফলে সরাসরি কর্মস্থল থেকেই তাঁকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা নিয়েছিল পুলিশ।
কিন্তু গোয়েন্দাদের সেই সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ভেস্তে যায় ভেতরেরই কোনো এক অজানা সূত্রে বার্তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে। সিসিটিভি ফুটেজ ও ব্যাংকের নিজস্ব নিরাপত্তা সূত্রের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, ডিবির গাড়ি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার ঠিক কয়েক মিনিট আগে নিজের ডেস্ক ছেড়ে উধাও হয়ে যান তিনি।
অভিযান পরিচালনাকারী গোয়েন্দা দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পুরো ভবনটি বিশালাকার হওয়ায় এবং একাধিক ইমার্জেন্সি এক্সিট বা জরুরি বের হওয়ার পথ থাকায় রকিবুল সহজে সটে পড়েন। ফলে মূল গেটে পুলিশ সতর্ক অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই তিনি উধাও হন।
এর পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের সীমান্ত এলাকা ও বিভিন্ন জেলায় ছায়া তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হচ্ছে তাঁর ব্যবহৃত ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম, ফোন রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগের প্রোফাইল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পলাতক রকি দেশ ছাড়ার চেষ্টায় থাকতে পারেন।
কোটি কোটি টাকার রহস্যময় ডিজিটাল লেনদেন
বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা পুলিশের পৃথক তদন্তকারী সূত্রগুলো যে তথ্য উদঘাটন করেছে, তা সত্যি চোখ কপালে তোলার মতো। প্রাথমিক ব্যাংকিং নথিপত্রে দেখা গেছে, অভিযুক্ত সহকারী পরিচালকের নামে ও বেনামে একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডজনখানেক ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক হিসাব খোলা রয়েছে।
এসব সাধারণ ও বিশেষ ব্যাংক হিসাবগুলোর মাধ্যমে গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক ও রহস্যময় লেনদেন ঘটেছে। এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে দ্রুত টাকা স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময়ে তা বিভিন্ন ই-ওয়ালেট বা হুন্ডি মাধ্যমে বিদেশে পাচারের শক্তিশালী সুতা খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নীতি অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই বসে এমন নিষিদ্ধ বিটকয়েন ও আন্ডারগ্রাউন্ড কয়েন কেনাবেচায় তাঁর সম্পৃক্ততা পুরো আর্থিক খাতের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
একই সঙ্গে দেশে বেআইনি হলেও বহাল তবিয়তে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক নানা অনলাইন বেটিং বা জুয়ার অ্যাপসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং জুয়াড়িদের অর্থ লেনদেনে মধ্যস্থতা করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। ডিজিটাল অপরাধ তদন্তকারী দল এখন তাঁর মূল ক্যাশফ্লো বা অর্থের উৎস অনুসন্ধানে নেমেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আর্থিক খাতে অভ্যন্তরীণ নজরদারির প্রশ্ন
দেশের প্রধান আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার একদম প্রাণকেন্দ্রে বসে কীভাবে একজন তরুণ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম এবং অবৈধ বেটিং অ্যাপের বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করলেন, তা নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাধারণ ব্যাংকিং গ্রাহকদের প্রতিটি ছোটখাটো লেনদেনে যখন কড়া সিআইবি ও নজরদারি বজায় রাখা হয়, তখন নিজের কর্মীর অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার আনাগোনা কীভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে গেল—সেই প্রশ্নও উঠছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব আইটি সিকিউরিটি সার্ভিস এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
ডিজিটাল অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ আর্থিক অনিয়ম নয়। এটি একটি বড় সাইবার সিন্ডিকেটের অংশ হতে পারে। তারা মনে করেন, একা একজন সহকারী পরিচালকের পক্ষে এত বড় ডিজিটাল সাম্রাজ্য এবং হুন্ডি চেইন সামলানো অসম্ভব। এর নেপথ্যে আরও বড় প্রভাবশালী চক্র বা বিদেশি কোনো অনলাইন জুয়ার সিন্ডিকেট জড়িত থাকার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
পলাতক রকিবুল হাসান খানকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত অর্থের প্রবাহ পুরোপুরি ট্র্যাক করা কঠিন হবে। ইতিমধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি বিশেষ ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তাঁর যাবতীয় ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
সোজা কথায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই ভয়াবহ ফাঁকফোকর বাংলাদেশকে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বা সাইবার আর্থিক অপরাধের ঝুঁকির মুখে নতুন করে দাঁড় করালো। এখন দেখার বিষয়, গোয়েন্দা পুলিশ কত দ্রুত পলাতক এই ব্যাংক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে অপরাধ চক্রের মূল গোড়ায় পৌঁছাতে পারে।

