বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরের অস্থিরতা যেন পিছু ছাড়ছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে থেকেই শুরু হওয়া ভঙ্গুর দশা থেকে বেরোনোর লড়াই চলছে এখনো। বড় বড় অনেক শিল্প গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের স্থবিরতার মাঝেও ২০২৫ সালের ব্যাংকিং খাতের প্রতিবেদনগুলো সবাইকে কিছুটা চমকে দিয়েছিল। তবে খাতা-কলমের সেই মুনাফার ঝিলিক শেয়ারবাজারে খুব একটা স্বস্তি ফেরাতে পারেনি।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে ডজনখানেক ব্যাংক তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা ঘরে তুলেছে, অন্যদিকে বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংকই এখন ‘দুর্বল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। ৩৬টি তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি ভালো অবস্থানে রয়েছে, আর বাকি ২০টিই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে।
২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, ২১টি ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার নতুন রেকর্ড গড়েছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প—যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আশঙ্কাজনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড। বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা ঢেলেছে সরকারি সিকিউরিটিজে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এই বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম এই প্রবণতাকে ‘অস্থায়ী মডেল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ব্যাংকগুলোর মূল কাজ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান তৈরি করা। কিন্তু তারা এখন নিরাপদ মুনাফার খোঁজে সরকারের ঋণদাতা হয়ে বসে আছে। এটি স্বল্পমেয়াদে ব্যাংককে লাভবান করলেও দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় কোনো অবদান রাখছে না।
মুনাফার এই জোয়ারের মাঝেও মুদ্রার উল্টো পিঠ অত্যন্ত ধূসর। এবি ব্যাংক, আইএফআইসি এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার কোটি টাকার লোকসানে হাবুডুবু খাচ্ছে। এবি ব্যাংক এক বছরেই ৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। খেলাপি ঋণের বোঝা আর তারল্য সংকট এসব ব্যাংককে খাদের কিনারায় নিয়ে ঠেকিয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকরণ নিয়ে। মুনাফা করা সত্ত্বেও টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে না পারায় অনেক ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারের ভাষায় ‘জেড’ মানেই হচ্ছে বিনিয়োগের জন্য বিপজ্জনক এলাকা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ২০টি ব্যাংকই কোনো না কোনোভাবে দুর্বল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর মতে, আস্থার সংকটই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষ এখন দেখেশুনে আমানত রাখছেন। কিছু ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমছে, অথচ গ্রাহক সুদও চাইছেন না; শুধু আসল টাকার নিরাপত্তা খুঁজছেন। অন্যদিকে, যারা নিয়ম অমান্য করে আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, তারাই এখন অস্তিত্ব সংকটে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান এই সাফল্যকে সুশাসনের ফল হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, সুশাসন বজায় থাকলে বাজারের পরিস্থিতি যাই হোক, টেকসই মুনাফা সম্ভব। সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনও মনে করেন, রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ায় তাদের ঋণের গুণগত মান ভালো ছিল, যা বড় মুনাফা এনে দিয়েছে।
তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য চিত্রটি বেশ জটিল। শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাতের শেয়ার মানেই এক সময় ছিল নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০টি ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা। লেনদেনে দীর্ঘ সময় লাগা এবং ঋণ সুবিধা বন্ধ থাকার কারণে এসব শেয়ারের চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
বাজার বিশ্লেষক এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মনে করেন, সুশাসনের অভাবই এই বৈষম্যের মূল কারণ। যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কম এবং তারল্য বেশি, তারাই টিকে থাকছে। আর যারা রাজনৈতিক প্রভাবে বা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ দিয়েছে, তাদের পতন ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতের এই ক্ষত সারাতে হলে শুধু মুনাফার দিকে তাকালে চলবে না। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরালো করতে হবে। আমানতকারীদের আস্থা না ফিরলে কেবল সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফেরানো সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, এই রেকর্ড মুনাফা কি প্রকৃত উন্নয়ন, নাকি কেবল সাময়িক হিসাবের কারসাজি? সাধারণ বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা এখন কেবল একটি স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপেক্ষায় আছেন, যেখানে মুনাফার চেয়ে নিরাপত্তা আর স্বচ্ছতা বেশি গুরুত্ব পাবে। আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

