দেশের ভঙ্গুর বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফেরানোর সব উদ্যোগ যেন বারবার থমকে যাচ্ছে অদৃশ্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে নিয়মনীতি ভেঙে যে পথ তৈরি করা হয়েছিল, সেই পুরোনো পথেই যেন আবার হাঁটছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নীতিগত সিদ্ধান্তে পুরোনো ধারার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে, যা দেশের পুরো আর্থিক খাতকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত সরকারের সময়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন ফি সাড়ে তিন টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র এক টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। এতে কিছু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী সরাসরি লাভবান হলেও চরম আর্থিক সংকটে পড়ে সার্বিক তদারকি ব্যবস্থা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই ফি যৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে আড়াই টাকা করা হলেও, বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর তা আবারও এক টাকায় নামিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার বড় ধরনের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দেশের অর্ধেকের বেশি বীমা প্রতিষ্ঠান যখন চরম আর্থিক দৈন্যে ভুগছে এবং গ্রাহকের দাবি মেটাতে পারছে না, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজের আয় কমিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল।
পুরোনো ইতিহাস ও ক্ষমতার প্রভাবে ফি হ্রাসের পেছনের গল্প
বীমা খাতের এই নিবন্ধন ফি বিতর্ক নতুন নয়। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশে প্রতি এক হাজার টাকা প্রিমিয়ামের বিপরীতে নিবন্ধন ফি নির্ধারিত ছিল সাড়ে তিন টাকা, যা মোট প্রিমিয়ামের শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে তৎকালীন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবীর হোসেন প্রভাব খাটিয়ে এই ফি কমিয়ে এক টাকায় নামিয়ে আনেন।
তৎকালীন বিআইএ নেতৃত্বের প্রভাবে ভারতের বীমা বাজারের উদাহরণ দেওয়া হলেও, বাংলাদেশের নিজস্ব বাজার বাস্তবতা ও আর্থিক কাঠামোর বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বীমা বাজারের নিজস্ব সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল বিশেষ কিছু মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষার্থেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এক প্রকার বাধ্য করা হয়েছিল এই ফি কমাতে।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তদারকি সংস্থা আইডিআরএ তাদের মূল আয় থেকে বঞ্চিত হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি নিজস্ব রাজস্ব দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় আইটি অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন করতে ব্যর্থ হয়, যা পরবর্তীতে গ্রাহকদের আমানত ও বীমা সুরক্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।
অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার চেষ্টা ও নতুন সংকট
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সর্বস্তরে যখন সংস্কারের হাওয়া বইছিল, তখন আইডিআরএর দায়িত্বে আসা ড. এম. আসলাম আলম বীমা খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফেরাতে উদ্যোগী হন। পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা এবং তদারকি ক্ষমতা জোরদার করতে তিনি নিবন্ধন ফি আড়াই টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর রেগুলেটরি ফি এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ব্যবসায়িক বছরের জন্য। কিন্তু ড. আসলাম আলমের বিদায়ের পর বীমা মালিকদের পক্ষ থেকে শুরু হয় নতুন চাপ। বর্ধিত ফি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তারা পুরো খাতকে কার্যত এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে ফেলে দেয়।
পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) ওপর নানা দিক থেকে মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মীর নাদিয়া নিভিন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পুরোনো দাবির মুখেই আবার নতিস্বীকারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সংস্কারের গতিকে পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বছরে ২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর বড় ঝুঁকি
আর্থিক বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আড়াই টাকা হারে ফি বজায় থাকলে ২০২৬ সালে আইডিআরএর সম্ভাব্য আয় হতো প্রায় ৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কিন্তু তা আবার এক টাকায় নামিয়ে আনা হলে সংস্থাটির পকেটে আসবে মাত্র ১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেবল একটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের কারণেই আইডিআরএ বছরে ২৭ কোটি টাকার বেশি সম্ভাব্য আয়ের পথ হারিয়ে ফেলবে।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল একটি সরকারি সংস্থার আয়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িত ছিল দেশের পুরো বীমা খাতের আইটি পরিকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং আমানতকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো।
রাজস্বের এই বড় ধাক্কা আইডিআরএর স্বাভাবিক তদারকি ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেবে। যেখানে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর্থিক আত্মনির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানে বারবার আয়ের পথ বন্ধ করে দিয়ে তাকে সরকারের দয়ার ওপর নির্ভরশীল করে রাখার প্রবণতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে।
কাঠামোগত সমাধানের বদলে ‘তাসের ঘর’ ধরে রাখার চেষ্টা
বীমা খাতের চলমান সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আইডিআরএর আয়ের অন্য কোনো বড় খাত নেই, তাই নিবন্ধনের অর্থই তাদের মূল চালিকাশক্তি। অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে যে ফি আড়াই টাকা করা হয়েছিল, তা আলোচনা ছাড়াই কমানো কোনো সুস্থ নীতি হতে পারে না।
ড. ইমাম আরও মন্তব্য করেন যে, ‘ব্যবসাবান্ধব’ পরিবেশ গড়ার যে অজুহাত দিয়ে ফি কমানো হচ্ছে, তা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বর্তমানে দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ৪২টির অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক বা কার্যত তাদের কোনো সুস্থ অস্তিত্ব নেই।
তিনি মনে করেন, নিবন্ধন ফি কয়েক পয়সা কমাল কি বাড়ল, তা দিয়ে এসব মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য বদলাবে না। ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা রূপরেখাতেও এখন প্রয়োজন একটি বিশেষ আইনি রেজোলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক। যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, সেগুলোকে একীভূত করা কিংবা দেউলিয়া ঘোষণা করে অবসায়নে যাওয়াই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা ও আইনি ব্যবস্থার দাবি
চলমান সমালোচনা ও প্রশাসনিক অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়নি; বরং এটি নেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ আইনি মতামতের ওপর ভিত্তি করে।
চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৬ সালের জন্য বীমা কোম্পানিগুলো যখন আবেদন করে, তখন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ফি ছিল এক টাকা। তাই আইনি জটিলতা এড়াতে ২০২৬ সালের জন্য পুরনো হারই বহাল রাখা হচ্ছে। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৭ ও ২০২৮ সাল থেকে নতুন নির্ধারিত আড়াই টাকা হার কার্যকর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে পছন্দের লোক নিয়োগ বা অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকারের বিদ্যমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে নতুন করে কোনো নিয়োগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনুমোদিত ১৫৫ জনের যে অর্গানোগ্রাম রয়েছে, তা পূরণ আছে এবং বিদ্যমান কর্মীরাই স্বচ্ছতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন।
সাধারণ গ্রাহকের ভবিষ্যৎ ও বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
আইডিআরএর এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাফোড়েনের চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের, যারা জীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছেন এসব বীমা কোম্পানিতে। একদিকে ফি কমানোর তোড়জোড়, অন্যদিকে দাবি মেটাতে ব্যর্থ হওয়া দুর্বল কোম্পানিগুলোকে ‘বেল আউট’ বা সরকারি অনুদান দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দুর্বল কোম্পানিকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে না রেখে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা বেশি জরুরি ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন নিজেই তার আয়ের উৎস হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ গ্রাহকের আস্থার জায়গাটি পুরোপুরি ধসে যায়।
বীমা খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা না গেলে কেবল গ্রাহকের আমানতই ঝুঁকিতে পড়বে না, বরং পুরো দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। প্রশাসনিক চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে কীভাবে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

