আরেকটি অন্ধকার রাত, আরেকটি রক্তাক্ত সড়ক এবং কয়েকটি চেনা দীর্ঘশ্বাস। দেশের সড়কগুলোতে মৃত্যুর মিছিল যেন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। এবার কুমিল্লার সদর দক্ষিণে যাত্রীবাহী বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন তিন জন মানুষ। শনিবার (৬ জুন) রাতের এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি আরও একবার আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার রূঢ় ও অনিরাপদ বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ রাত ৮টার দিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়কের সদর দক্ষিণ উপজেলার রতনপুর এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সংযোগকারী এই ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কটিতে রাতের বেলায় যানবাহনের গতিবেগ সাধারণত অনেক বেশি থাকে। ঘটনার সময়ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তীব্র গতির দুটি যানের এই সংঘর্ষে মুহূর্তের মধ্যে নিভে যায় তিনটি তাজা প্রাণ।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা ও লালমাই হাইওয়ে থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই থাকা তিন আরোহীর শরীর থেকে প্রাণবায়ু উড়ে যায়।
উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের স্বপ্নভঙ্গ ও রতনপুরের অন্ধকার
নিহতদের তাৎক্ষণিক নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারা কেউ স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন না। জীবিকার তাগিদে সুদূর উত্তরবঙ্গ থেকে কুমিল্লা অঞ্চলে এসেছিলেন তারা। রতনপুর ও এর আশপাশের এলাকায় তারা দিনমজুর বা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
শনিবারের সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে হয়তো তারা নিজেদের অস্থায়ী ডেরায় ফিরছিলেন। কিংবা রাতের খাবারের কোনো প্রয়োজনে বাজারে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা যে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা হবে, তা কে জানত। উত্তরবঙ্গের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে হয়তো এখনো কোনো মা, স্ত্রী বা সন্তান পথ চেয়ে বসে আছেন তাদের প্রিয়জনের একটি ফোনের আশায়। সেই ফোনে এখন আর কোনো চেনা কণ্ঠ শোনা যাবে না, যাবে কেবল কান্নার রোল।
লালমাই হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওসমান গণি দুর্ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘাতক বাসটিকে আটক করার চেষ্টা চলছে। তবে দুর্ঘটনার পরপরই বাসের চালক ও হেলপার ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
শাহ আলী সুপারের গতি ও মুখোমুখি সেই সংঘাত
পুলিশ ও স্থানীয় হাইওয়ে ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, ‘শাহ আলী সুপার’ নামের একটি যাত্রীবাহী মিনিবাস যাত্রী নিয়ে নোয়াখালীর দিক থেকে কুমিল্লা শহরের দিকে আসছিল। বাসটির গতিবেগ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল বলে দাবি করেছেন কয়েকজন পথচারী। রতনপুর বাজার এলাকা পার হওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটির মুখোমুখি হয় বাসটি।
আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহাসড়কের একপাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলা অটোরিকশাটিকে তীব্র গতির বাসটি সরাসরি সামনে থেকে আঘাত করে। বাসের ব্রেকের কর্কশ আওয়াজ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই অটোরিকশারোহী তিন শ্রমিক পিষ্ট হন চাকার নিচে।
রতনপুর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমরা তখন বাজারের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি, অটোরিকশাটা বাসের নিচে ঢুকে গেছে। আমরা তিনজনকে টেনে বের করলাম, কিন্তু কারোরই জ্ঞান ছিল না। শরীরগুলো রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।”
পরিচয় শনাক্তে পুলিশের তৎপরতা ও আইনি প্রক্রিয়া
লালমাই হাইওয়ে থানার ওসি ওসমান গণি জানান, নিহতদের পকেটে বা সাথে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র বা নথি পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে তাদের তাৎক্ষণিক পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। তবে তারা যে উত্তরবঙ্গের একটি শ্রমিক দলের সদস্য, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশ ওই এলাকার অন্যান্য শ্রমিক ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাম-পরিচয় বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ওসি আরও বলেন, “মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে লাশগুলো লালমাই হাইওয়ে থানায় সংরক্ষিত রয়েছে। এই বিষয়ে একটি নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা কীভাবে এক্সপ্রেস লাইনে চলে এলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে শাহ আলী সুপার পরিবহনের বাসটির চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল কিনা, সেই বিষয়েও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক সড়কের চেনা মরণফাঁদ ও প্রশাসনের ভূমিকা
কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়কটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চার লেনে উন্নীত করা হলেও এটি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে রতনপুর, লালমাই এবং লাকসাম অংশের কিছু বাঁক ও বাজার এলাকায় প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে হাইওয়ে পুলিশের টহল কমে যাওয়ার সুযোগে দূরপাল্লার বাসগুলো প্রতিযোগিতামূলক গতিতে চলাচল করে।
তাছাড়া, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা ও নসিমন-করিমনের মতো ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল এই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চগতির বাসের সামনে হঠাৎ করে এই ছোট যানগুলো চলে এলে চালকেরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন না। রতনপুরের এই ঘটনাটি তারই এক নির্মম উদাহরণ।
পরিবেশ ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা বারবার দাবি করে আসছেন, কেবল বড় রাস্তা বানালেই হবে না, সেখানে ছোট ও বড় যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে গ্রামীণ জনপদের এই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলো এভাবেই প্রতিদিন সড়কের বালুচরে হারিয়ে যাবে।
শেষ না হওয়া এক ট্র্যাজেডির অপেক্ষা
শনিবার রাতের এই তিন মৃত্যুর ঘটনা কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষের মনে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দুর্ঘটনার পর রতনপুর এলাকায় কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হলেও হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়। তবে সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও, নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জীবন আর কখনো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে না।
পরিচয় পাওয়ার পর যখন এই লাশগুলো উত্তরবঙ্গের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছাবে, তখন আরেকটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে। জীবিকার খোঁজে ঘর ছাড়া এই মানুষগুলোর এমন মর্মান্তিক পরিণতি দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
রতনপুরের এই অন্ধকারের পেছনে দায়ী কে? বাসের বেপরোয়া গতি নাকি অটোরিকশার অবৈধ অনুপ্রবেশ? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আদালতের নথিতে মিলবে। কিন্তু যে তিনটি প্রাণ ঝরে গেল, তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কোনো আইনের নেই। কুমিল্লার এই সড়ক ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি যাত্রা এখনো কতটা অনিশ্চিত আর প্রতিটি জীবন কতটা সস্তা এ দেশের পিচঢালা রাজপথে।

