ঈদের আনন্দটুকু এখনো লেগে ছিল চোখে-মুখে। নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ঘুরে চেনা কর্মস্থলে ফিরেছিলেন হাজারো মানুষ। কিন্তু সাভারের উলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য শনিবারের সকালটি ছিল এক চরম দুঃস্বপ্নের। কারখানার মূল ফটকে ঝুলতে থাকা একটি নোটিশ মুহূর্তেই বদলে দেয় ১৮৬৪ জন শ্রমিকের জীবন।
কারখানায় ঢোকার মুখে নিরাপত্তারক্ষীরা যখন নোটিশ বোর্ডের দিকে আঙুল তুললেন, তখনো কেউ ভাবেননি কী অপেক্ষা করছে সেখানে। নোটিশে লেখা ছিল—তাদের আর এই কারখানায় প্রয়োজন নেই। চাকরি হারানোর এই আকস্মিক খবরে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যান শ্রমিকেরা। ক্ষোভ ও হতাশা রূপ নেয় তীব্র বিক্ষোভে।
শনিবার (৬ জুন) সকাল থেকেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল বাসস্ট্যান্ড ও রেডিও কলোনি এলাকায় জড়ো হতে থাকেন আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানার কয়েকশ ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক। কারখানার প্রধান ফটকের সামনে শুরু হয় শ্লোগান। পরিস্থিতি একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনটি সম্পূর্ণ অবরোধ করেন।
উৎসবের পর আকস্মিক ছাঁটাইয়ের আঘাত
পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়লে উলাইল ও আশপাশের এলাকায় তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। সংঘাত এড়াতে এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের শিল্প পুলিশ। সাঁজোয়া যান নিয়ে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নেন কারখানার সামনে।
কারখানার ফটকে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছিলেন জয়নব নামের এক নারী পোশাক শ্রমিক। গত তিন বছর ধরে এই কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন তিনি। ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগে সব শ্রমিকই আশা করেছিলেন, ছুটি শেষে আবার স্বাভাবিক নিয়মে শুরু হবে জীবনযাত্রা। কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভুক্তভোগী জয়নব বলেন, “ঈদের ছুটিতে যখন গ্রামে ছিলাম, তখন হঠাৎ বিকাশে এক মাসের বেতন পাঠানো হয়। আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এর পরপরই মোবাইলে একটি খুদে বার্তা আসে, যাতে লেখা ছিল আমাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এভাবে উৎসবের পর আমাদের রাস্তায় বসিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না।”
বকেয়া পাওনা নিয়ে খামখেয়ালিপনা
শ্রমিকদের মূল দাবি, এই গণছাঁটাই অবিলম্বে বাতিল করে তাদের কাজে পুনর্বহাল করতে হবে। আর যদি কারখানা কর্তৃপক্ষ তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী কমপক্ষে তিন মাসের অগ্রিম বেতনসহ সব বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া এই ছাঁটাইকে তারা বেআইনি বলে দাবি করছেন।
আরেকজন অপারেটর সাগরিকা বেগমের গল্পটা আরও দীর্ঘ এবং কষ্টের। ২০১৭ সাল থেকে আল-মুসলিম গ্রুপে অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন তিনি। জীবনের প্রায় নয়টি বছর এই কারখানার সেলাই মেশিনের চাকার সঙ্গে ঘুরিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার পাওনা টাকার হিসাবও বেশ জটিল।
সাগরিকা বলেন, “ছুটি শেষে এসে শুনি আমার চাকরি নেই। মোবাইলে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমার হিসাব অনুযায়ী, আমি গত ৯ বছরের সেবার জন্য ৯টি পূর্ণকালীন বেতন এবং তিন মাস ১৩ দিনের বকেয়া টাকা পাব। কোনো আলোচনা ছাড়া কোম্পানি নিজের ইচ্ছামতো টাকা দিয়ে আমাদের বিদায় করতে পারে না।”
কর্তৃপক্ষের আইনি ব্যাখ্যা ও দ্বিমত
গণছাঁটাইয়ের এই ঘটনার পর কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক নেতারা। আল-মুসলিম গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান অবশ্য দাবি করেছেন, তারা যা কিছু করেছেন তা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই করা হয়েছে।
মো. আবু রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, “শ্রমিকদের শ্রম আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী তাদের আইনগত সব পাওনা এবং এক মাসের অতিরিক্ত বেতন আমরা ইতিমধ্যে পরিশোধ করেছি। এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।”
তবে শ্রম আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী তিন মাসের বেতন দেওয়ার বিষয়ে শিল্প পুলিশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “২৬ ধারা নিয়ে কোনো আলোচনা আমাদের জানা নেই। তবে কোনো শ্রমিক যদি এক মাসের বেতন না পেয়ে থাকেন, তবে আমরা সেই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি।”
পুলিশের মধ্যস্থতা ও আশ্বাসের বাস্তবতা
মহাসড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিল্প পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রমিক প্রতিনিধি এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকে বসেন।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ ১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, “আমরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি। রাস্তা বন্ধ রাখলে সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়, এটা তাদের বোঝানো হয়েছে।”
পুলিশ সুপার আরও দাবি করেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর তারা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর দুপুরের দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন।
পোশাক খাতে অস্থিরতার নতুন শঙ্কা
অবরোধ প্রত্যাহারের পর দুপুরের পর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে আল-মুসলিম কারখানার সামনে বিকেল পর্যন্ত শ্রমিকদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। পুলিশের আশ্বাসে তারা সাময়িকভাবে রাস্তা ছাড়লেও ক্ষোভের আগুন এখনো কমেনি।
গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা ও স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, এই ধরণের গণছাঁটাই সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের সামগ্রিক পোশাক খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ঈদের পর যেখানে কারখানায় উৎপাদন বাড়ার কথা, সেখানে এত বড় সংখ্যক শ্রমিককে একসঙ্গে ছাঁটাই করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
শ্রমিকদের একটি বড় অংশ জানিয়েছেন, রবিবারের মধ্যে যদি মালিকপক্ষ তাদের পুনর্বহাল বা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত ঘোষণা না দেয়, তবে তারা আবারও আন্দোলনে নামবেন। সাভারের এই শিল্পাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে হলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

