রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত পথগুলো হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত গলিয়ে একের পর এক মানবদলকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিচ্ছে তারা। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতন্দ্র প্রহরা, নিশ্ছিদ্র নজরদারি আর তীব্র প্রতিরোধে বিএসএফের সেই পুশইনের সব কটি চেষ্টাই এ পর্যন্ত মাঠে মারা গেছে।
সীমান্তের এই আকস্মিক অস্থিরতায় খুলনা বিভাগের বিস্তীর্ণ জনপদে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার সীমান্তজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা বেষ্টনী। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনীই নয়, দেশের মাটি রক্ষায় লাঠিসোটা আর টর্চলাইট হাতে বিজিবির সঙ্গে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় সীমান্তবাসীও। স্থলপথের পাশাপাশি নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের জলসীমানায় কোস্ট গার্ডের সমন্বিত টহল এই প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
বিজিবির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র শিথিলতা বা ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ওপার থেকে যেকোনো ধরনের পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দিতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং মাঠপর্যায়ে তাদের অনড় অবস্থান বজায় রয়েছে।
তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে রুদ্ধশ্বাস ভোর ও ছয় ভাগ্যের অবরুদ্ধ দশা
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে। শনিবার (৬ জুন) ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, ১৪০/৫-এস আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের নিকটবর্তী হাটপাড়া এলাকায় আকস্মিক এক তোড়জোড় শুরু করে বিএসএফ। তারা ওপার থেকে ছয়জন মানুষকে জোর করে সীমানা পার করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পুশইন করার চেষ্টা চালায়।
কিন্তু সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের মানুষ এবং বিজিবির টহল দল আগে থেকেই সতর্ক ছিল। বিএসএফের মুভমেন্ট টের পেয়েই তারা সীমান্তে এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ লাইন তৈরি করেন। বিজিবি ও গ্রামবাসীদের এই যৌথ অনড় অবস্থানের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা শেষ পর্যন্ত ওই দলটিকে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকাতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ওই ছয়জন হতভাগ্য মানুষ দুই দেশের মধ্যবর্তী নো-ম্যান্সল্যান্ড বা শূন্যরেখায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিজিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে, পুশইনের শিকার হওয়া এই দলটির মধ্যে দুজন পুরুষ, দুজন নারী, একজন বৃদ্ধ এবং একটি অবুঝ শিশু রয়েছে। খোলা আকাশের নিচে তাদের এই মানবেতর অবস্থান সীমান্তে এক থমথমে পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজিবি ওই পয়েন্টে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত জোয়ান মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে ওপারে থাকা বিএসএফকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে যাতে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে এই মানুষদের দ্রুত তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়।
তেঁতুলবাড়ীয়া বিওপির কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল বজায় রাখছি। পুশইনকৃতদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিএসএফকে হ্যান্ড মাইকে অনবরত বার্তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছি—কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন বাংলাদেশ মেনে নেবে না। সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা এই বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো অনুপ্রবেশকারী বা পুশইনের চেষ্টা এ মাটিতে সফল হতে দেওয়া হবে না। আমরা বিএসএফকে এই সংকটের আইনি ও সুশৃঙ্খল সমাধানের জন্য জরুরি পতাকা বৈঠকের (ফ্ল্যাগ মিটিং) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছি। সেই বৈঠকের আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার আগে থেকেই সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ রুখতে মেহেরপুরের গাংনী, মুজিবনগর ও সদর উপজেলার পুরো সীমান্তজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল বিজিবি। ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত পয়েন্টগুলোতে শক্তিশালী হাইভোল্টেজ সার্চলাইট বসানো হয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া সীমান্তে রাত জাগা গ্রাম ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত এলাকার চিত্রটি আরও বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও মানবিক। সেখানে বিএসএফের একাধিক পুশইনের চেষ্টা শুধু বিজিবির সুশৃঙ্খল কৌশলের কারণেই নয়, বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভূতপূর্ব দেশপ্রেমের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। ওপার থেকে যখনই কোনো পুশইনের গুঞ্জন ছড়াচ্ছে, তখনই গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে পুরুষেরা রাত জেগে লাঠি হাতে পাহারা দিচ্ছেন।
৪৭ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এই দৌলতপুর জোনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই জোরদার করা হয়েছে যে, বিএসএফের একটি চেষ্টাও আলোর মুখ দেখেনি। সীমান্তজুড়ে দিন-রাত নিয়মিত মাইকিং করে স্থানীয়দের সতর্ক করছে বিজিবি। আর এই মাইকিংয়ের ফলে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমান্ত প্রতিরক্ষাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এদিকে এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দুই দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী দালাল চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, যাদের কাজ মূলত টাকার বিনিময়ে পুশইন সফল করা। বিজিবি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এই চক্রের কয়েকজনকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও মেহেরপুরের গাংনী সীমান্ত এলাকা দিয়ে গত কয়েক দিনে একাধিকবার পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। আজ সকালেও মেহেরপুরের গাংনীর তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ছয়জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আমাদের জোয়ান ও গ্রামবাসী মিলে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাদের আমরা শূন্যরেখায় আটকে দিয়েছি।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রনি আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, “এর ৪-৫ দিন আগেও দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইনের একটি বড় চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। কিন্তু সীমান্তবাসীর প্রতিরোধে তারা সুবিধা করতে পারেনি। এই অবৈধ কারবারের সঙ্গে কিছু দালাল চক্র জড়িত আছে। আমরা তাদের কয়েকজনের নাম-পরিচয় এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ দেশের নিরাপত্তা নিয়ে খেলার সাহস না পায়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সীমান্তে এখন ২৪ ঘণ্টা লাইভ টহল, মাইকিং ও সতর্কতামূলক কার্যক্রম চলছে। সম্ভাব্য পুশইন পয়েন্টগুলোতে আমাদের ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সীমান্তে এখন অনেক বেশি জনবল মোতায়েন রয়েছে। সীমান্ত রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। এই ক্রান্তিকালে সীমান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকরা আমাদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।”
মহেশপুর সীমান্তে ১০ বার চেষ্টা ও ওপারে মানুষের ভিড়
ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে পুশইন আতঙ্ক এখন চরমে। স্থানীয় সীমান্ত এলাকার মানুষের অভিযোগ, বিএসএফ যেন এক প্রকার নিয়ম করেই দফায় দফায় বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে পাঠানোর মিশন হাতে নিয়েছে। তবে প্রতিটি মিশনই বিজিবির কঠোর বাধার মুখে ভেস্তে যাচ্ছে। মহেশপুরের ১২টি সীমান্ত চৌকির (বিওপি) মধ্যে বিশেষ করে যাদবপুর বিওপি এলাকাটি এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পয়েন্টটি দিয়েই বিএসএফ সবচেয়ে বেশি পুশইনের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে বিজিবিও বসে নেই। প্রতিটি বিওপিতে নজরদারি ও টহলের তীব্রতা বাড়ানো হয়েছে। মহেশপুরের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের দাবি, সীমান্তের ঠিক ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও বাসে করে নিয়মিত নতুন নতুন মানুষকে এনে জড়ো করা হচ্ছে। ওপারে এই মানুষের অস্বাভাবিক সমাবেশ দেখে সীমান্তবাসী আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় রাতের আঁধারে বড় আকারের নতুন পুশইনের চেষ্টা হতে পারে।
৫৮ বিজিবির পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম মহেশপুর সীমান্তের বর্তমান স্ট্যাটাস জানিয়ে বলেন, “মহেশপুর সীমান্তে এ পর্যন্ত বিএসএফের ১০টি পৃথক পুশইনের চেষ্টা আমরা অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিহত করেছি। আমাদের জওয়ানেরা ওপারে সব ধরনের মুভমেন্ট ট্র্যাক করছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমাদের সকল সদস্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
সাতক্ষীরার জল-স্থল সীমান্তে ড্রোনের চোখ ও কোস্ট গার্ডের গর্জন
নারী, পুরুষ ও শিশুদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার এই আশঙ্কাজনক প্রবণতাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা সীমান্তে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। ওপারে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর থেকেই জেলার জল ও স্থল সীমান্তজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ভারতের সঙ্গে সাতক্ষীরার প্রায় ১৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল জল ও স্থল সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে ৮৪ কিলোমিটার এবং ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে রয়েছে ৫৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা। পুশইনসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই দুই ব্যাটালিয়নই এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্তে কড়া অবস্থান নিয়েছে।
সীমান্তের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গত ২৬ মে থেকে কলারোয়া উপজেলার কেড়াগাছি ও চন্দনপুর সীমান্তের ঠিক বিপরীতে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর এলাকায় অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে এনে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, তাদের যেকোনো উপায়ে বাংলাদেশে পুশইন করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএসএফ।
পরবর্তীতে বিএসএফ কয়েক দফায় এই বিশাল জনস্রোতকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি নিয়ে এলেও বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন এবং কড়া নজরদারির কারণে কোনো বড় ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটতে পারেনি। তবে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে বড় আকারে পুশইন সম্ভব না হলেও বিএসএফ রাতের অন্ধকারে ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিচ্ছিন্নভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে পারে। আর এই আশঙ্কার কারণেই সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
এই আতঙ্ক দূর করতে কলারোয়ার কেড়াগাছি, চন্দনপুর, কাকডাঙ্গা, মাদরা, পদ্মশাখরা, হিজলদীসহ প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় দিন-রাত সমান তালে স্পেশাল টহল জোরদার করা হয়েছে। সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সাতক্ষীরা সীমান্তে আমাদের টহল, নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে কাউকে এক কদমও বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে দেওয়া হবে না। যেকোনো ধরনের পুশইনের চেষ্টা কঠোর হস্তে প্রতিহত করা হবে।”
অন্যদিকে নীলডুমুরস্থ ১৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ার রাজিব তার অধীনস্থ জল ও স্থল সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে বলেন, “আমাদের দায়িত্বপূর্ণ ৮৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। কোনোভাবেই অবৈধ অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না। সীমান্ত পরিস্থিতি আমরা সার্বক্ষণিক মনিটর করছি।”
সাতক্ষীরার এই বিশাল জলসীমান্ত ও নদীপথের নিরাপত্তায় বিজিবির পাশাপাশি এখন পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুর হোসেন বাহিনীর প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেন, “আমাদের রুটিন ডিউটির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে অতিরিক্ত কন্টিনজেন্ট ও স্পিডবোট টহল জোরদার করা হয়েছে। নদী ও উপকূলীয় সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি চলছে। এমনকি রাতের অন্ধকারে নজরদারির জন্য আমরা উন্নত প্রযুক্তির ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি করেছি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোস্ট গার্ডের সব ধরনের লজিস্টিক প্রস্তুতি রয়েছে।”
বেনাপোলে সার্চলাইট বন্ধের রহস্য ও তিন দিনের টানটান উত্তেজনা
যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের এক অভিনব ও রহস্যময় পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি। সেখানে প্রায় ১১০ থেকে ১২০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর একটি বড় পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গত রোববার (৩১ মে) রাত ১২টার দিকে বেনাপোলের রঘুনাথপুর সীমান্ত পিলার ১৯/৩-এস থেকে ১৯/৫-এস পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্ত সড়কে আচমকা তিনটি বড় গাড়ি এসে থামে।
এর কিছুক্ষণ পরই আকস্মিকভাবে ভারতীয় অংশের সব সীমান্ত নিরাপত্তা বাতি বা সার্চলাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাইভোল্টেজ লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় বিজিবি এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। রাতের সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওই ১১০ থেকে ১২০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা আগে থেকেই পজিশন নিয়ে সতর্ক থাকায় বিএসএফের সেই মূল চেষ্টাটি ব্যর্থ হয়। পরে উপায়ান্তর না দেখে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পার করে নারী-শিশুসহ ১০-১২ জনকে জোরপূর্বক শূন্যরেখায় রেখে চলে যায় বিএসএফ সদস্যরা।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সঙ্গে সঙ্গে কড়া অবস্থানে যায় বিজিবি। বিজিবির সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় সাধারণ যুবকেরা। একপর্যায়ে ২ জুন দুপুর ১২টার দিকে যশোর ৪৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে নীল রঙের পতাকা উড়িয়ে বিজিবির আটজনের একটি বিশেষ দল সীমান্তের শূন্যরেখায় যায় বিএসএফের সঙ্গে আলোচনার জন্য। কিন্তু ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে এড়িয়ে যায়। ফলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসেন বিজিবি সদস্যরা।
এদিকে নারী ও শিশুসহ শূন্যরেখায় অবস্থানকারী ওই ১০ থেকে ১২ জন মানুষ তীব্র রোদে ও কষ্টে সেখানে আটকে পড়েন। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। সেখানে দীর্ঘ তিন দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার পর, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবশেষে তাদের সীমান্ত থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
বেনাপোলের সাদিপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক সীমান্তের বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, “১০-১২ জন লোককে বাংলাদেশি দাবি করে সম্পূর্ণ অবৈধ ও জোরপূর্বক উপায়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। বিজিবি শক্ত অবস্থানে থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। আমরা দেশের মানুষ হিসেবে প্রস্তুত আছি। কোনো অবৈধ পুশইন যাতে না হয়, সে জন্য আমরা দিন-রাত বিজিবিকে সব ধরনের লজিস্টিক ও তথ্যগত সহযোগিতা করছি।”
যশোর ব্যাটালিয়নের (৪৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান জানান, ভারতের এই অবৈধ পুশইন পলিসি রুখে দিতে সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের দায়িত্বপূর্ণ ৭০.২৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণও বুক দিয়ে সীমান্ত আগলে রাখছেন।
তিনি আরও বলেন, “আমরা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অনবরত মাইকিং করছি। সেখানে ভারত থেকে যেকোনো ধরনের তথাকথিত পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে সীমান্তবাসীকে আহ্বান জানানো হচ্ছে এবং জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছে। যতদিন প্রয়োজন মনে হবে, ততদিন আমাদের এই মাইকে প্রচার ও যৌথ পাহারা চলবে।”
চুয়াডাঙ্গায় ভোররাতের অ্যাকশন ও ১০ অনুপ্রবেশকারী আটক
সীমান্তে কড়া নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বিজিবি। গত রোববার (৩১ মে) ভোর আনুমানিক ৫টা ১৫ মিনিটের দিকে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধীন বারাদি বিওপির একটি নিয়মিত টহল দল সীমান্ত এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের সময় চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টাকালে হাতেনাতে ১০ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের পরিচয় ও প্রোফাইল যাচাই করে বিজিবি জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ২ জন পুরুষ, ৩ জন নারী এবং ৫ জন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে। তাদের ওপার থেকে পুশইন করা হয়েছিল নাকি তারা কোনো দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার হচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান এই অভিযানের বিষয়ে বলেন, “বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সীমান্ত এলাকায় ৬ বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যাতে আমাদের সীমানায় অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের ঘটনা না ঘটতে পারে, সে লক্ষ্যে সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রটোকল জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় টহল কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনবলও কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান আরও যোগ করেন, “সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিজিবি সার্বক্ষণিক নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের জোয়ানেরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।”
দক্ষিণাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে বিএসএফের এই ধারাবাহিক পুশইন চেষ্টা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক ডেস্ক ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাতের অন্ধকারে এভাবে জোরপূর্বক মানুষকে নো-ম্যান্সল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী। বাংলাদেশ সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে দিল্লির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা বা কড়া প্রতিবাদ জানানো হয় কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে মাঠপর্যায়ে বিজিবি ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রমাণ করে দিয়েছে—রাতের অন্ধকারে পুশইনের কোনো খেলাই বাংলাদেশের মাটিতে সফল হতে দেওয়া হবে না।

