দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। আসন্ন ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে দেশের কোনো সরকারি হাসপাতালে হামের রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত এবং জরুরি বিভাগের ডাক্তার ও নার্সরা ছুটি পাবেন না। মহামারিসদৃশ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার (২৩ মে) দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে স্পষ্ট যে, উৎসবের চেয়ে দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে টিকাদানের হার কম থাকায় শিশুরা এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংকটের খবরও আসছে গণমাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদের লম্বা ছুটিতে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
ঈদের ছুটির মধ্যেও খোলা থাকবে বিশেষায়িত ওয়ার্ড
সচিবালয়ের ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা মন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, যেসব হাসপাতালে ইতিমধ্যেই হামে আক্রান্ত আশঙ্কাজনক শিশুরা ভর্তি রয়েছে, সেগুলোতে ঈদের ছুটির দিনগুলোতে চিকিৎসকেরা উপস্থিত থাকবেন কি না। অনেক সময় ঈদের মৌসুমে হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট দেখা দেয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ রোগীদের।
এই উদ্বেগের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “ইনশাল্লাহ, চিকিৎসকেরা অবশ্যই হাসপাতালে থাকবেন। আমরা ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে একটি জরুরি দাপ্তরিক সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন জারি করেছি। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসকদের মাঠে থাকা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।” বিষয়টি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সামনে আোনায় তিনি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান।
মন্ত্রী আরও যোগ করেন, “আপনাদের মাধ্যমে আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমাদের পুরো স্বাস্থ্য বিভাগ এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। হামের রোগী এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত কোনো ডাক্তার বা নার্সের ঈদের ছুটি এবার মঞ্জুর করা হবে না। তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থেকে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।”
শতভাগ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না ভ্যাকসিন
সংবাদ সম্মেলনে শিশুদের হামের টিকা বা ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও কেন নতুন করে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকেরা। বর্তমান সরকারের গণটিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা দূর করার চেষ্টা করেন মন্ত্রী। তবে তার বক্তব্যে কিছুটা বিজ্ঞানসম্মত সংশয়ও প্রকাশ পায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের একটি বাস্তব কথা বুঝতে হবে। ভ্যাকসিন বা টিকা নিলেই যে একটি শিশুর শরীরে ১০০ পার্সেন্ট হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে এবং সে কোনোদিন আক্রান্ত হবে না, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। পৃথিবীর কোনো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাই শতভাগ নিশ্চিত নয়।”
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, “একসময় বলা হতো স্মল পক্স বা গুটিবসন্ত পৃথিবী থেকে পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে। কলেরা রোগও একপ্রকার বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু এখন দেখুন, সামাজিকভাবে এখনো মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেও রোগের ধরন বদলাচ্ছে।”
প্রতিরোধের দেয়াল ভাঙার কারণ
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার তারতম্যের ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “যদি মানুষের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা রেসিস্ট্যান্সের মাত্রা কোনো কারণে কমে যায়, তবে সে সহজেই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা পচা-তিতা খাবার খাওয়ার ফলেও মানুষ নতুন করে পুরনো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। হামের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম খাটছে।”
ভাইরাসের রূপান্তর ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা নিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও অকপটে স্বীকার করেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, “যদি সামাজিকভাবে এই ভাইরাসটি খুব তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে টিকাপ্রাপ্ত শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। তবে এর বৈজ্ঞানিক গ্যারান্টি কতটুকু, তা আমি বলতে পারব না। কারণ আমি কোনো বিজ্ঞানী নই, আমি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাত্র।”
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত তীব্র বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে এর ড্রপলেট ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ শিশুরা সেই বাতাস গ্রহণ করলে সহজেই আক্রান্ত হয়। তাই কেবল ভ্যাকসিনের ওপর ভরসা না করে সামাজিক দূরত্ব ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
মায়েদের প্রতি মন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধ
আসন্ন ঈদুল আজহায় লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাবেন। বাস, ট্রেন এবং লঞ্চে থাকবে গাদাগাদি ভিড়। এই গণপরিবহনের ভিড় হামের সংক্রমণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিপদের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে দেশের সব মায়েদের প্রতি এক বিশেষ আকুল আবেদন জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, “যেসব মায়েদের সন্তান ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়েছে বা যাদের শরীরে সামান্যতম উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, দয়া করে এই ঈদের সময় তাদের নিয়ে কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাবেন না। উৎসবের আনন্দের চেয়ে আপনার সন্তানের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। আপনার একটু অসচেতনতা অন্য একটি সুস্থ শিশুর জীবন বিপন্ন করতে পারে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “যেসব স্থানে প্রচণ্ড ভিড় বা জনসমাগম বেশি, যেমন পশুর হাট বা শপিং মল—সেখানে বাচ্চাদের কোনোভাবেই নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার একটি ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলেই, তার শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরে এটি বাসা বাঁধে।”
ঈদের গণপরিবহন ও বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি এবং দেশের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের সেই পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা প্রেডিক্ট করছেন যে, ঈদে মানুষের অবাধ মেলামেশা বা ফ্রি মিক্সিংয়ের ফলে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”
মন্ত্রী বলেন, “ঈদের এই সময়ে বাস যাত্রা, ট্রেন যাত্রা কিংবা লঞ্চে যেভাবে মানুষ যাতায়াত করে, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা অসম্ভব। এই যাতায়াতের পথে যদি কোনো সুস্থ শিশু একজন হামের রোগীর সংস্পর্শে আসে, তবে ঈদের পর আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার একটি ভয়াবহ সম্ভাবনা বা পসিবিলিটি তৈরি হবে। আমাদের এই চেইনটা ভাঙতে হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা লক্ষণ প্রকাশের সময়কাল সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন। ফলে ঈদের ছুটিতে যারা আক্রান্ত হবে, তাদের লক্ষণগুলো প্রকাশ পাবে জুনের প্রথম সপ্তাহে। তখন দেশের হাসপাতালগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে পারে। এই আগাম সংকট সামাল দিতেই মন্ত্রীর এই কঠোর পদক্ষেপ।
মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি ও ওষুধের মজুত
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশনার পর দেশের সব জেলা সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মজুত বাড়ানোর কাজ চলছে।
বিশেষ করে ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কারণ চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্ধত্ব ও অন্যান্য জটিলতা রোধে ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ঈদের ছুটির দিনগুলোতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা পর্যাপ্ত প্যারাসিটামল ও ওআরএস স্যালাইন মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সচল রাখার পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করার তাগিদ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে মায়েরা যেন লক্ষণ চিনতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিকভাবে সচেতনতার বিকল্প নেই
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের পর স্বাস্থ্য খাতে যে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে এই ধরণের কঠোর সিদ্ধান্ত পজিটিভ ভূমিকা রাখবে। তবে কেবল ডাক্তারদের ছুটি বাতিল করেই এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব নয়, যদি না সাধারণ নাগরিকেরা সচেতন হন।
জনসাধারণের একটি বড় অংশের মধ্যে এখনো হাম হলে ডাক্তার না দেখিয়ে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁক করার এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রবণতা রয়েছে। এই লোকজ বিশ্বাসের কারণে অনেক সময় শিশুরা একদম শেষ মুহূর্তে গুরুতর নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) নিয়ে হাসপাতালে আসে, তখন চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকে না।
তাই এবারের ঈদে ধর্মীয় খুতবা এবং গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে হামের ভয়াবহতা ও করণীয় সম্পর্কে প্রচার চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সার্বিক পরিস্থিতি দিনে দুই বার মনিটর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উৎসবের দিনেও দেশের দেবদূত সমতুল্য চিকিৎসকেরা যেভাবে ঈদ বিসর্জন দিয়ে হাসপাতালে থাকছেন, তার প্রতি দেশের সাধারণ মানুষেরও শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা কাম্য।

