আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার নতুন দাম ঘোষণা করেছে সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই নতুন মূল্য তালিকা প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের ট্যানারি শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা করে এবার গত বছরের তুলনায় দামে কিছুটা সমন্বয় আনা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এ বছর রাজধানী ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। গত বছরের তুলনায় যা সামান্য বেশি। অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে সারা দেশে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া বিক্রি হবে ৫৭ থেকে ৬২ টাকায়। চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের লোকসান থেকে বাঁচাতে এই দরের নিচে চামড়া কেনাবেচা না করার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত কেবল গরুর চামড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। সারা দেশে খাসির চামড়ার দর প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বকরির চামড়ার দাম ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা। প্রান্তিক পর্যায়ের চামড়া সংগ্রহকারীরা যাতে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যে কঠোর নজরদারি চালানোর ঘোষণা দিয়েছে বাণিজ্য প্রশাসন।
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, প্রতি বছর উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। মূলত লবণের উচ্চমূল্য বা সংকটের কারণে অনেক সময় সময়মতো চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয় না। এই সমস্যা সমাধানে এবার সরকার নিজ উদ্যোগে সারা দেশে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চামড়া সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ লবণ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে সরাসরি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। মাঠ পর্যায়ের মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এই লবণের সুবিধা পাবেন, যাতে চামড়া পচে যাওয়ার ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনা যায়।
চামড়া শিল্পের সংকট মূলত শুরু হয় পশুর জবাইয়ের ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। অভিজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে লবণ দিতে না পারলে কাঁচা চামড়ার গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে যায় এবং দেশীয় ট্যানারিগুলো মানসম্মত কাঁচামাল পায় না। সরকারের এই ‘ফ্রি লবণ’ কর্মসূচি চামড়া নষ্ট হওয়ার হার অনেকাংশে কমিয়ে আনবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না একটি চামড়াও নষ্ট হোক বা পাচার হয়ে যাক। চামড়া আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় সরকার সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত।” তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকা দিয়ে চামড়া পাচার রোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
দেশের ট্যানারি মালিকরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিনিধি জানান, সঠিক দামে চামড়া কেনা নিশ্চিত করা গেলে এবং লবণের সরবরাহ থাকলে ফিনিশড লেদার তৈরিতে খরচ কমবে। এতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে। তবে দাম নির্ধারণের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, রাজধানীর পোস্তা ও হাজারীবাগের চামড়া আড়তদাররা বলছেন, সরকারের নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমে থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন কতটুকু ঘটবে তা নির্ভর করছে চাহিদার ওপর। অনেক সময় পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেন। ফলে প্রান্তিক কোরবানিদাতা বা এতিমখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার বিনামূল্যে লবণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটাবে বলে তারা মনে করছেন।
২০২৬ সালের এই বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় তদারকি সেল গঠন করা হবে, যারা কোরবানির দিন থেকে পরবর্তী সাত দিন চামড়া কেনাবেচার বাজার পর্যবেক্ষণ করবে। যদি কোনো আড়তদার বা ট্যানারি মালিক নির্ধারিত দরের নিচে চামড়া কেনার চেষ্টা করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
চামড়া কেবল একটি পণ্য নয়, এর সাথে দেশের হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার বার্ষিক আয়ের একটি বড় অংশ জড়িত। কোরবানির চামড়ার টাকা সাধারণত গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। তাই চামড়ার দাম কমে গেলে সামাজিক এই নিরাপত্তা বলয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার এই মানবিক দিকটি বিবেচনা করেই এবার দামে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
বিসিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লবণের চালানগুলো ইতিমধ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে পৌঁছাতে শুরু করেছে। তারা নিশ্চিত করছেন যে, কোরবানির অন্তত তিন দিন আগেই উপজেলা পর্যায়ে লবণের মজুদ নিশ্চিত করা হবে। লবণ বিতরণে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সেজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপের ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কাঁচা চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা ব্লু-ওয়েট বা ফিনিশড লেদার হিসেবে রপ্তানি করে বাংলাদেশ আগের চেয়ে বেশি আয় করতে পারবে। মূলত চামড়া শিল্পের চেইনটি সুশৃঙ্খল রাখতেই সরকার এবার আগাম এবং সাহসী কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
চামড়া পাচার নিয়ে প্রতি বছরই এক ধরনের শঙ্কা কাজ করে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চামড়া চলে গেলে দেশীয় শিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়ে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বাড়তি টহল বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, এবার দেশে কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত যোগান রয়েছে। ফলে চামড়ার সরবরাহও গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে ট্যানারিগুলোকে আগেভাগেই প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সিইটিপি (CETP) যাতে পূর্ণ সক্ষমতায় চলে, সেদিকেও নজর দিচ্ছে বিসিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণের বরাদ্দ দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে চামড়া ছাড়ানো ও লবণ মাখানো নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অপেশাদার কসাইদের কারণে চামড়ার মাঝখানে কাটা পড়ে যায়, যা চামড়ার মান নষ্ট করে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রচারণামূলক ভিডিও ও লিফলেট বিতরণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চামড়া খাতে এক ধরনের নতুন প্রাণসঞ্চার করতে চাইছে সরকার। বিনামূল্যে লবণ এবং নির্ধারিত মূল্যের সমন্বয় যদি সফলভাবে কার্যকর হয়, তবে চামড়া খাতের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। সরকার আশা করছে, এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে, অন্যদিকে শক্তিশালী হবে দেশের শিল্প খাত।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ব্রিফিং শেষ হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও লবণের উদ্যোগটি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কোরবানির মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু নিশ্চিত হয়। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণই বলে দেবে এই পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস হলো চামড়া শিল্প। তৈরি পোশাক খাতের পরেই এই শিল্পের অবস্থান এক সময় শীর্ষে থাকলেও মাঝপথে নানা সংকটে তা ম্লান হয়ে পড়েছিল। সরকারের এই নতুন নীতিমালা ও বিনামূল্যে লবণের জোগান সেই সংকটে একটি কার্যকর দাওয়াই হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে চামড়া খাতের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে, সরকার ঘোষিত এই নতুন দাম এবং লবণ বিতরণ প্রক্রিয়া যাতে কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও ব্যবসায়ীদের সততা নিশ্চিত হলে ২০২৬ সালের কোরবানি চামড়া খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং লাখো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষারও একটি পদক্ষেপ।

