আসন্ন ঈদুল আজহার ঘরমুখো মানুষের ভিড় আর চিরাচরিত ভোগান্তির মাঝে নারী যাত্রীদের জন্য এক বড় স্বস্তির খবর বয়ে আনল উচ্চ আদালত। আইনের ১২৬ বছর পুরনো বিধানকে পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনে নারীদের জন্য অন্তত একটি পৃথক কামরা বা কোচ বরাদ্দ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার এক আদেশের মাধ্যমে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যা বিশেষ করে আসন্ন ঈদের ভিড়ে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ দেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আজমল হোসেন খোকন। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে, রেলওয়ের সংবিধিবদ্ধ আইনে নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে নারীরা যখন ট্রেনে যাতায়াত করেন, তখন তাদের নানাবিধ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
আইনজীবী মো. আজমল হোসেন খোকন শুনানিতে ব্রিটিশ আমলের ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের প্রসঙ্গটি বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে জানান, ওই আইনের ৬৪ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি কামরা বরাদ্দ থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, যদি সেই ট্রেনটি ৫০ মাইলের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে, তবে ওই কামরার সঙ্গে অবশ্যই একটি শৌচাগার বা টয়লেট সংযুক্ত থাকতে হবে।
আইনের এই বিধানটি কাগজে-কলমে থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এই উপেক্ষা চলার পর ২০২১ সালে আইনজীবী মমতাজ পারভীন জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। সেই রিটের প্রেক্ষিতে আদালত আগেই একটি রুল জারি করেছিলেন। কিন্তু আসন্ন ঈদুল আজহায় ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একটি সম্পূরক আবেদন করা হয়, যার প্রেক্ষিতে আজ এই চূড়ান্ত নির্দেশনা এলো।
রেলওয়ে আইনের ১১৯ ধারার কথাও আজ আদালতে আলোচিত হয়। এই ধারা অনুযায়ী, নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোনো কামরায় যদি কোনো পুরুষ যাত্রী বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেন, তবে তাকে জরিমানার আওতায় আনা হবে। আইনের এই কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও যথাযথ তদারকির অভাবে নারীরা সাধারণ কামরায় গাদাগাদি করে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন। উচ্চ আদালত আজ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ঈদের সময় এই আইন কোনোভাবেই শিথিল করা যাবে না।
আদেশের পর আইনজীবী আজমল হোসেন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, “রেলে চড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের মা-বোনেরা যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করেন, তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। আইনের বিধানটি কার্যকর হলে এবারের ঈদে নারীরা অন্তত কিছুটা স্বস্তিতে এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।”
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অবশ্য এর আগে বিভিন্ন সময় আসন সংকটের অজুহাত দেখিয়ে পৃথক কামরা বরাদ্দের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। তবে এবারের হাইকোর্টের কড়া নির্দেশের পর তারা কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রেলওয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর তারা দ্রুত প্রকৌশল ও বাণিজ্যিক বিভাগের সঙ্গে বসে কোচ বিন্যাস পরিবর্তনের কাজ শুরু করবেন।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ট্রেনগুলোতে যাত্রী ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ যাতায়াত করে। বিশেষ করে ঈদের সময় ট্রেনের ছাদে পর্যন্ত মানুষের ভিড় থাকে। এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় একটি নির্দিষ্ট কামরা কেবল নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সদিচ্ছা থাকলে এবং রেলওয়ে পুলিশ কঠোর হলে এটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব কিছু নয়।
যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও এই আদেশকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, ট্রেনের সাধারণ কামরায় প্রায়ই নারীরা হেনস্তার শিকার হন। পৃথক কামরা থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে নিরাপদে কথা বলতে ও ভ্রমণ করতে পারবেন। বিশেষ করে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের নিয়ে যেসব মায়েরা ভ্রমণ করেন, তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট কামরা এবং সংযুক্ত শৌচাগার থাকাটা বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকার।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, কেবল ঈদ নয়, বছরের সব সময়ই এই নিয়ম বলবৎ রাখা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, “আইনটি ১৮৯০ সালের হলেও এর প্রয়োজনীয়তা ২০২৬ সালে এসে আরও বেড়েছে। আমরা চাই প্রতিটি ট্রেনেই যেন মা-বোনদের জন্য নিরাপদ একটি জায়গা থাকে।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই আদেশটি একটি মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতিটি স্তরে লিঙ্গভিত্তিক সংবেদনশীলতা থাকা কতটা জরুরি। রেলওয়ে আইনের এই প্রয়োগ যদি সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে বাসে কিংবা লঞ্চেও নারীদের জন্য বিশেষায়িত আসনের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জোরালো হবে।
রেলমন্ত্রী অবশ্য সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন যে, এবারের ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে তারা স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস চালু করছেন। এখন হাইকোর্টের নির্দেশের পর সেই স্পেশাল ট্রেনগুলোতেও পৃথক নারী কামরা যোগ করতে হবে। এতে করে টিকেট বিক্রির পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাধারণত টিকেটের ওপর কামরা নম্বর উল্লেখ থাকে, তাই নারীদের জন্য আলাদা কাউন্টার বা অনলাইনে বিশেষ কোটা রাখা হতে পারে।
ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফেরা। আর সেই ফেরার পথটা যেন কাঁটাযুক্ত না হয়, তার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত আজ এক রক্ষাকবচ প্রদান করলেন। এখন মাঠ পর্যায়ে রেলওয়ে কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব এবং পুরুষ যাত্রীদের সচেতনতাই বলে দেবে, এই আইনের সুফল নারীরা কতটুকু ভোগ করতে পারবেন।
উচ্চ আদালত তাঁর আদেশে আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন কেবল রেলের দায় নয়, বরং এটি নাগরিকদের একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। একটি সভ্য সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম সারির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচারপতিদের এই পর্যবেক্ষণ কেবল একটি আইনি নির্দেশ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রতি একটি শক্তিশালী বার্তাও।
আজকের এই ঐতিহাসিক নির্দেশের ফলে আসন্ন ঈদুল আজহায় লাখ লাখ নারী যাত্রীর মুখে হাসি ফুটবে—এমনটিই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। রেলের ঝকঝক শব্দে মেঠো পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে বাড়ি ফেরার আনন্দ যেন কোনো গ্লানি বা অস্বস্তির কারণে মলিন না হয়, সেই নিশ্চয়তা দিতেই আজ বিচার বিভাগ তাঁর অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালন করল।
এখন সময়ের দাবি হলো, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুততম সময়ে তাদের কোচগুলোর ম্যাপিং পরিবর্তন করে এবং প্রতিটি স্টেশনে মাইকিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করে। আইনের বইয়ে ঘুমিয়ে থাকা একটি অনুচ্ছেদ আজ জেগে উঠেছে, এখন তাকে রাজপথে (বা রেলপথে) জীবন্ত করে তোলার দায়িত্ব প্রশাসনের।
ঈদুল আজহার কোরবানির প্রস্তুতি আর কেনাকাটার ডামাডোলের মাঝে ট্রেনের এই খবরটি দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। স্বজনদের প্রতীক্ষায় থাকা মায়েরা হয়তো এখন আরও একটু নিশ্চিন্তে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকবেন। আইনের শাসনের এই জয় জয়কার যেন শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রেল স্টেশনে দৃশ্যমান হয়, সেই দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

