গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের যে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠছিল, তা এখন চরম সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। হাসপাতালের করিডোরগুলোতে স্বজনদের আহাজারি আর শিশুদের যন্ত্রণাকাতর মুখগুলো বলে দিচ্ছে, জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবার বিকেলের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, নতুন করে মারা যাওয়া এই ৯ শিশুর মধ্যে ৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল। বাকি ৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে। চিকিৎসকরা বলছেন, উপসর্গ থাকা শিশুদেরও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
কেবল মৃত্যু নয়, নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও রীতিমতো আতঙ্ক জাগানিয়া। গত এক দিনে সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ১৯২ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের এই জোয়ারে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত শয্যা আর জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সংকটে অনেক পরিবারকেই এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে দেখা গেছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে মহামারির এই ভয়াবহ রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত দেড় মাসে দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৪২৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া মৃত্যুর সংখ্যা ৬৮। অন্যদিকে, রোগ নির্ণয়ের আগেই বা কেবল উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৫৬ জন শিশু। এই বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ মে সকাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ের মধ্যে ৫১ হাজার ৫৬৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত করা গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা হয়তো সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
ভৌগোলিক বিন্যাস অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। জনবহুল এই বিভাগটিতে গত দুই মাসে হাম ও সন্দেহভাজন হামে ১৮৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও এখানে সর্বোচ্চ—প্রায় ২৭ হাজার ৯৩২ জন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বস্তি অঞ্চলগুলোতে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ নার্স জানান, প্রতিদিন শত শত শিশু আসছে তীব্র জ্বর আর শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে। অনেকের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে, যা মূলত মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে। কোভিড পরবর্তী সময়ে অনেক শিশু নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শূন্যতা এখন ভাইরাসের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
হাম একটি অতি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে এটি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাসের হাত থেকে শিশুকে বাঁচাতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। তবে বর্তমানে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের দ্রুত আইসোলেশন এবং সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সারা দেশে বিশেষ সার্ভিলেন্স টিম গঠন করেছেন। যেসব এলাকায় মৃত্যু ও সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও কুসংস্কার চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, কেবল টিকাদান নয়, পুষ্টির অভাবও শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণ এবং শিশুদের সুষম খাবার নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে যেসব শিশু ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, ঢাকার বাইরের চিত্র আরও করুণ। অনেক জেলা হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা এনআইসিইউ সুবিধা। ফলে সংকটাপন্ন শিশুদের নিয়ে ঢাকায় আসার পথেই অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, গ্রামের অনেক মা-বাবা এখনো হামকে সাধারণ জ্বর মনে করে বাড়িতেই হাতুড়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রতি জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শিশুর শরীরে ঘামাচির মতো দানা দেখা দিলে, চোখ লাল হলে বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
হামের এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে যখন নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তখন শিশুদের এমন অকাল মৃত্যু পুরো জাতিকে ব্যথিত করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নাগরিকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই ধরণের ভাইরাস আরও শক্তিশালী হতে পারে। তাই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং দাতা গোষ্ঠীগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে টিকার মজুদ বাড়ানো এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বেগবান করা এখন সময়ের দাবি।
আজকের এই রিপোর্ট যখন তৈরি করা হচ্ছে, তখনও দেশের কোনো না কোনো হাসপাতালে হয়তো আরেকটি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এই মৃত্যুর মিছিল থামানোর একমাত্র পথ হলো সমন্বিত উদ্যোগ ও দ্রুত পদক্ষেপ। একটি শিশুও যেন টিকার অভাবে বা চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি শিশুর জীবনের মূল্য অপরিসীম। দেড় মাসে ৪২৪টি ছোট প্রাণ ঝরে যাওয়া কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, এটি ৪২৪টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী ও অভেদ্য করতে হবে।
দেশের এই জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সব ভেদাভেদ ভুলে শিশুদের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। হামের এই প্রকোপ যেন মহামারি আকার ধারণ করতে না পারে, সেজন্য এখনই চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায়, আগামীর বাংলাদেশে মেধার যে বিকাশের কথা আমরা ভাবছি, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

