রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ড আজ এক নতুন সংকল্পের সাক্ষী হয়ে রইল। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার আর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের গ্লানি মুছে ফেলে পুলিশ বাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও সর্বোপরি মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়াররম্যান তারেক রহমান। রোববার পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর ‘কল্যাণ প্যারেড’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশের প্রয়োজনীয়তা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমানের এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আর এই বাহিনীর মূল দর্শন হওয়া উচিত—দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের লালন।
তারেক রহমান তার ভাষণে বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক তিক্ততার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে পুলিশ বাহিনীকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই অন্ধকারের সময় এখন অতীত। এখন সময় এসেছে নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। পুলিশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের হৃত বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।
পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের রসায়ন কেমন হওয়া উচিত, তার একটি মানবিক রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে সম্পূর্ণ আইনগত এবং মানবিক। কোনো ভয়ভীতি নয়, বরং আস্থা ও নির্ভরতাই হবে এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। বিপদে পড়া মানুষ যেন সবার আগে পুলিশকে তাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে কল্পনা করতে পারে, সেটিই সরকারের একমাত্র চাওয়া।
রাষ্ট্রের মালিকানা নিয়ে একটি গভীর দর্শন প্রচার করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের মনে করিয়ে দেন যে, দেশের সাধারণ জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। যখন কোনো নাগরিক বিপদে পড়ে থানায় যান, তখন পুলিশের আচরণে যেন তিনি সেই মালিকানার সম্মানটুকু অনুভব করতে পারেন। এই বোধটি প্রতিটি পুলিশ সদস্যের হৃদয়ে গেঁথে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আইনি সহায়তার প্রথম ধাপ হিসেবে থানার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে বিচার বা আশ্রয়ের আশায় প্রথমেই থানায় ছুটে যান। তাই থানার পরিবেশ হতে হবে জনবান্ধব। পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা থানাগুলোকে এমনভাবে সংস্কার করতে চাই যেখানে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা ‘দালাল’ ছাড়াই সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, পুলিশ প্রশাসন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তার নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে প্রবেশ করেছে। এই গ্লোবাল ভিলেজ মানুষের জীবনযাত্রার যেমন পরিবর্তন এনেছে, তেমনি বদলে দিয়েছে অপরাধের ধরনও। অপরাধীরা এখন অনেক বেশি চতুর এবং প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর। তাই বাংলাদেশ পুলিশকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন ও যুগোপযোগী বাহিনীতে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমান বলেন, অপরাধ বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেবল গতানুগতিক তদন্ত দিয়ে বর্তমান সময়ের জটিল অপরাধগুলো সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বদ্ধপরিকর।
মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি তার বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, বর্তমান সরকার দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া গুম, অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ কর্মকাণ্ডকে তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভবিষ্যতে বরদাশত করা হবে না।
প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। সংবিধানের আলোকে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে নতুন বাংলাদেশের পুলিশের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বাহিনীর প্রতিটি স্তরের সদস্য এই শপথ ধারণ করে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন।
কল্যাণ প্যারেড পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয়েও খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, বাহিনীর উন্নয়ন এবং সদস্যদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে বিনিময়ে জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে শতভাগ। পুলিশ যখন সততার সাথে কাজ করবে, তখন দেশ ও জাতি নিরাপদ থাকবে।
অনুষ্ঠানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং তারা প্রধানমন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনাকে বাহিনীর জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার যে পরিবেশ এখন তৈরি হয়েছে, তা বাহিনীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
রাজারবাগের এই আয়োজনটি কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্র ও পুলিশের মধ্যকার এক নতুন সামাজিক চুক্তির ঘোষণা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে ফুটে ওঠা ‘মানবিক পুলিশ’ গড়ার অঙ্গীকার যদি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
বিকেলে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেই অমোঘ বাণী—‘পুলিশের কাজ দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’—প্রতিটি পুলিশ সদস্যের কানে তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সাধারণ মানুষও বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে এমন একটি দিনের, যখন পুলিশকে দেখে তারা ভয় নয়, বরং ভরসা পাবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই যাত্রায় পুলিশ বাহিনীই হবে সামনের সারির সৈনিক।
পরিশেষে বলা যায়, ১০ মে-র এই ভাষণটি কেবল একটি নির্দেশনামা নয়, এটি ছিল পরিবর্তনের ইশতেহার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ বাহিনীকে দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বের এক নতুন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের সেই অতন্দ্র প্রহরীরা জনগণের আস্থার প্রতিদান কতটুকু দিতে পারেন। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে পুলিশের এই রূপান্তরই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।

