দেশের শিল্প খাতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ঘোষণা করেছেন যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে অকেজো ও লোকসানি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। হাজার হাজার বিঘা জমি অলস ফেলে রাখা এসব প্রতিষ্ঠানকে কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত করতেই সরকার এই কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই মেলায় দেশের প্যাকেজিং শিল্পের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একেকটির দখলে ৫ থেকে ১০ হাজার বিঘা পর্যন্ত জমি রয়েছে। কোনো কোনোটি আবার ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার একর জমি দখল করে বসে আছে। অথচ বছরের পর বছর এগুলো উৎপাদনহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল শিল্প মন্ত্রণালয় নয়, বরং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীনেও আরও অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর বিশাল ভূখণ্ড এখন কেবল নামমাত্র সরকারি সম্পদ হিসেবে পড়ে আছে। লোকসানি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি বছর সরকারকে বিশাল অংকের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের সরকারি কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের বৃত্তে বন্দি। এই অলসতা দূর করে সেখানে উৎপাদন শুরু করতে হবে। আমরা চাই এসব জায়গায় বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক, যাতে নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে ওঠে এবং দেশের তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।”
একটি বাস্তব উদাহরণ টেনে মন্ত্রী জানান, দেশে এমন ১৫টি সুগার মিল রয়েছে যেগুলোর একেকটির অধীনে কমপক্ষে এক হাজার বিঘা জমি আছে। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে এই একেকটি সুগার মিলের জায়গায় অন্তত ১০টি করে আধুনিক ফ্যাক্টরি স্থাপন করা সম্ভব। আয়তন ও সক্ষমতা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে দুটি প্রধান সমস্যার কথা স্বীকার করেন। প্রথমটি হলো প্রক্রিয়াগত জটিলতা। তিনি বলেন, “দেশে ব্যবসা শুরু করতে গেলে রেজিস্ট্রেশনসহ নানা ধাপে উদ্যোক্তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে বা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় নিয়ে আসার কাজ করছি।”
দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে তিনি পণ্য উৎপাদন ব্যয়ের উচ্চমূল্যকে চিহ্নিত করেন। কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। মন্ত্রীর মতে, উৎপাদন ব্যয় না কমলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে ‘ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো’র গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্যাকেজিং এখন আর কেবল মোড়ক নয়; এটি একটি পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও গুণগত মানের পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত প্যাকেজিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। এই খাতকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও সিইও মোহাম্মদ হাসান আরিফ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করেন। তিনি জানান, সরকার ২০২৬ সালের জন্য প্যাকেজিং পণ্যকে ‘বর্ষপণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সারা বছরজুড়ে এই খাতের রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে ইপিবি।
বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর এই খাতের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্যাকেজিং শিল্পের বাজার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার। এই খাতে বর্তমানে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারের তুলনায় এটি খুবই সামান্য।
সামি আলমগীরের মতে, বিশ্বজুড়ে প্যাকেজিং শিল্পের বাজার ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশ যদি এই বিশাল বাজারের মাত্র এক শতাংশও দখল করতে পারে, তবে এই খাতের রপ্তানি আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। তবে এজন্য মান নিয়ন্ত্রণ এবং রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এক্সপোনেট এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক মনে করেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলা দেশি উদ্যোক্তা ও বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। এটি কেবল প্রদর্শনী নয়, বরং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি বড় মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং খাতে ৬ হাজারের বেশি উৎপাদন ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০টি ইউনিট সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। এই পুরো খাতটি দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পূরণ করছে এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার সংস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বেসরকারীকরণের ঘোষণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী কিন্তু চ্যালেঞ্জিং। সরকারি জমি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে জমি পৌঁছে দেওয়া সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। তবে সফলভাবে এটি সম্পন্ন হলে দেশের শিল্পায়নে নতুন জোয়ার আসবে।
বিশেষ করে সুগার মিল বা টেক্সটাইল মিলের বিশাল এলাকাগুলোতে যদি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ গড়ে তোলা যায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হবেন। এটি কেবল উৎপাদন বাড়াবে না, বরং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
মেলায় প্রদর্শিত আধুনিক প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি ও পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল দেখে দর্শনার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তারা মনে করছেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী সহায়তা এবং ঋণ প্রাপ্তি সহজ হলে এই খাতটি পোশাক খাতের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই অকেজো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এগুলোকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই এই প্রকল্পের মূল সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপোটি কেবল একটি মেলা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্প খাতের নতুন পথচলার সাক্ষী হয়ে থাকবে। বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী যদি সত্যিই দুই বছরের মধ্যে সরকারি অলস জমিগুলো কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে, তবে তা হবে দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।
ডিজিটাল বাংলাদেশের পর এখন ‘স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন সরকার দেখছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে বেসরকারি খাত। আর সেই বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করতেই সরকার নিজের হাতে থাকা অকেজো সম্পদের মায়া ত্যাগ করে তা উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সাহসী পথে হাঁটছে।

