উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়াকে ঘিরে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। জেলাটিতে কেবল একটি সাধারণ বিমানবন্দর নয়, বরং সাড়ে ১০ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়ে বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার সকালে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা এই ঘোষণা দেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত পরিদর্শনের পর সংবাদমাধ্যমকে জানান, বগুড়াকে দেশের অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হচ্ছে। প্রস্তাবিত সাড়ে ১০ হাজার ফুটের রানওয়েটি এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি বড় আকারের আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী উড়োজাহাজ অনায়াসেই ওঠানামা করতে পারে।
এই পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী মিজ আফরোজা খানম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সরকারের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এই বিমানবন্দর প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আফরোজা খানম তার বক্তব্যে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় আমরা এই এলাকাটি পরিদর্শনে এসেছি। উত্তরাঞ্চলের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত আকাশপথের কোনো বিকল্প নেই। বগুড়াবাসীর জন্য এটি একটি বড় পাওয়া এবং মন্ত্রণালয়ের এই বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার যাত্রা শুরু হচ্ছে মূলত বগুড়া দিয়েই।”
প্রকল্পের কারিগরি দিক তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এখানে যুক্ত করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কার্গো ভিলেজ বা কার্গো ফ্যাসিলিটি। উত্তরবঙ্গ যেহেতু কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে অত্যন্ত সমৃদ্ধ, তাই এখান থেকে সরাসরি বিদেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
বর্তমানে বগুড়া থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কৃষিপণ্য পাঠাতে দীর্ঘ সময় এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। কার্গো বিমান চলাচলের সুবিধা চালু হলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই অঞ্চলের টাটকা সবজি, ফলমূল এবং শিল্পজাত পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এটি উত্তরাঞ্চলের রপ্তানি বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিমানবন্দরটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় একটি আধুনিক পাইলট ট্রেনিং একাডেমি স্থাপনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এভিয়েশন সেক্টরে দক্ষ জনশক্তির অভাব মেটাতে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে এই একাডেমিটি বড় ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে বগুড়া কেবল যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল নয়, বরং কারিগরি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। প্রতিরক্ষা এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে তার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতারসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং বিমানবন্দরের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন।
বগুড়ার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সংবাদে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের নেতারা মনে করছেন, এই বিমানবন্দরটি চালু হলে এখানে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আনাগোনা বাড়বে। পর্যটন খাতের জন্যও এটি হবে আশীর্বাদ স্বরূপ, কারণ মহাস্থানগড়সহ উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও সহজলভ্য হবে।
প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত তার বক্তব্যে আরও যোগ করেন, সাড়ে ১০ হাজার ফুটের রানওয়ে মানেই হলো এটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমমানের উড্ডয়ন ক্ষমতা সম্পন্ন হবে। এতে করে কেবল যাত্রী পরিবহন নয়, বরং জরুরি অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বিকল্প অবতরণস্থল হিসেবেও বগুড়া বিমানবন্দর ব্যবহৃত হতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ হয়েছে এবং এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) ও ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু হবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করা। এই বিমানবন্দরটি সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশাল রানওয়ে এবং কার্গো টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সরকার পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করেই আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে।
বর্তমান সরকার দেশের এভিয়েশন সেক্টরকে বিশ্বমানে উন্নীত করার যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, বগুড়া বিমানবন্দর তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। উত্তরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে একটি সচল বিমানবন্দরের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৯৬ সালের দিকে একবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে এবারের বড় রানওয়ে ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ঘোষণা বগুড়ার চিত্র বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
বিভাগীয় শহর রাজশাহী এবং পর্যটন শহর সৈয়দপুরের পর বগুড়ায় এই আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের পরিকল্পনা মূলত একটি ‘ইকোনমিক ট্রায়াঙ্গেল’ বা অর্থনৈতিক ত্রিভুজ তৈরির প্রচেষ্টা। এর ফলে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক আন্তঃনির্ভরশীলতা বাড়বে এবং ঢাকার ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। শিল্পায়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এই প্রকল্প বড় সহায়ক হবে।
বগুড়া বিমানবন্দর পরিদর্শনের এই ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাঞ্চল বিএনপির একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় এই বৃহৎ প্রকল্পের ঘোষণা স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের জনপ্রিয়তা এবং আস্থাকে আরও সুসংহত করবে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পরিশেষে, বগুড়ায় সাড়ে ১০ হাজার ফুটের রানওয়ে এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়, এটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি মাধ্যম। সঠিক সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গ আর পিছিয়ে পড়া অঞ্চল থাকবে না, বরং এটি হবে বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন এক প্রবেশদ্বার। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।
বগুড়ার আকাশসীমা দিয়ে যখন বড় বড় বোয়িং বা এয়ারবাসগুলো ওঠানামা করবে, তখন তা কেবল যাত্রীদের সুবিধা দেবে না, বরং এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার মানকেও বদলে দেবে। একটি বিমানবন্দর যে একটি জনপদের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, তার প্রমাণ বগুড়া খুব শীঘ্রই দিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

