দেশের অর্থনীতির আগামীর গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আগামী ৭ জুন শুরু হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
আগামী ৭ জুন, রোববার বিকেল ৩টায় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রতি বছরের মতো এবারও এই অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ও দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই বাজেটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির পরপরই সংসদ সচিবালয় তাদের যাবতীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এবারের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করা হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের বাজেট অধিবেশন কেবল একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংসদ সচিবালয়ের উপসচিব শওকত আকবর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়কে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাধারণত জুন মাসে বাজেট অধিবেশন বসে এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ৩০ জুনের মধ্যে তা পাস করা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এছাড়া সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সঠিক তদারকি নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের মানুষ যখন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই বাজেট অধিবেশন তাদের জন্য কতটা স্বস্তি বয়ে আনবে, তা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাজেটে করের বোঝা না বাড়িয়ে সরাসরি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
সংসদের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো জানিয়েছে, বাজেট পেশের পর বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে এর ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নেবেন। তারা নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন চাহিদা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তাদের মতামত তুলে ধরবেন।
নিরাপত্তার খাতিরে সংসদ ভবন এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের দিন দর্শনার্থীদের প্রবেশে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হতে পারে বলে সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বার্ষিক ব্যয়ের মূল পরিকল্পনা মূলত এই বাজেটেই নিহিত থাকে। তাই ৭ জুনের এই অধিবেশনটি কেবল আইন প্রণেতাদের জন্য নয়, বরং দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সাধারণ দিনমজুর—সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অধিবেশনের প্রথম দিকে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে পারেন, যেখানে সরকারের গত এক বছরের অর্জন এবং আগামীর পরিকল্পনার একটি খসড়া চিত্র থাকতে পারে। এরপর অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের জন্য বিশাল অঙ্কের বাজেটের প্রস্তাব পেশ করবেন।
২০২৬ সালের এই বাজেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার দাবি তোলা হয়েছে।
বাজেট অধিবেশন সফলভাবে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে সংসদ টেলিভিশনের কারিগরি টিমকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেন সাধারণ মানুষ সরাসরি এই অধিবেশন প্রত্যক্ষ করতে পারেন এবং রাষ্ট্রের অর্থের বরাদ্দ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে পারেন।
সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বাজেট হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের সহায়ক। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা না দিয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল লক্ষ্য।
৭ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক অধিবেশন শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সংসদ ভবন এখন প্রস্তুত এক মহাযজ্ঞের সাক্ষী হতে।

