রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে কেবল নিয়ম-নীতির শৃঙ্খলে আটকে না রেখে একে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানবিক করে তোলার এক নতুন বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বুধবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এক দীর্ঘ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মিলন ‘ত্রৈমৈত্রী’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সেবা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতার মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে আনা। তার মতে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থার ওপর।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে সাধারণ মানুষ যেন সম্মানের সাথে সেবা পায়, তা নিশ্চিত করা কর্মকর্তাদের প্রধান দায়িত্ব। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, আইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবিকতা আইনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অসুস্থ বা বয়স্ক নাগরিকদের ক্ষেত্রে নিয়ম পালনের পাশাপাশি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি।
একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারি অফিসে যান, তিনি আসলে সেই কর্মকর্তার মাধ্যমেই পুরো সরকারকে মূল্যায়ন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “একজন দিনমজুর যখন তার সমস্যার সমাধান পেতে আপনাদের দপ্তরে আসেন, তিনি হয়তো জানেন না কোন টেবিলে যেতে হবে। সেখানে কর্মকর্তাদের আন্তরিক ব্যবহার রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তার আস্থা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।”
বিপরীতে, কোনো নাগরিক যদি সরকারি অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হন, তবে সেটি কেবল একজন ব্যক্তির বঞ্চনা নয়, বরং পুরো শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনে বিতৃষ্ণা তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেন যে, তাৎক্ষণিকভাবে সব সমস্যার সমাধান হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু কর্মকর্তারা আন্তরিক কি না—সেটি মানুষ ঠিকই বুঝতে পারে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার তারা করেছিলেন, তা এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নেই। জনগণের বিশাল রায়ের পর সেই ইশতেহার এখন রাষ্ট্রীয় দলিলে পরিণত হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করাই প্রশাসনের মূল কাজ।
মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারেক রহমান কর্মকর্তাদের ‘সরকারের অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকগণ যদি সফলভাবে জনগণের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে পারেন, তবেই সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য নিশ্চিত হবে। জনস্বার্থে নেওয়া যে কোনো কাজ বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব আমলাতন্ত্রের কাঁধেই বর্তায়।
বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যাশার চাপ যে অনেক বেশি, সেটিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। সেবাগ্রহীতারা যখন সরকারি অফিসে যান, তারা যেন সেই ‘মালিকানা’র মর্যাদা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করার জন্য তিনি কঠোর নির্দেশ দেন।
দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের কথা জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনশক্তিকে যদি সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তারাই হবে আগামীর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, বরং জনসম্পদে রূপান্তর করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পরিবার এবং সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে পরিবার। যদি পারিবারিকভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক নৈতিকতা বজায় থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধকেও সুসংহত করে। রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে পরিবারগুলোকেও নৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে।
প্রশাসনের সংস্কার এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে তারেক রহমান কর্মকর্তাদের নির্ভয়ে এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে আপনারা যদি কোনো আইনগত বা মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তবে সরকার সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে এবং সব ধরনের সহায়তা দেবে।
এই বার্ষিক সম্মিলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মূলত একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন—জনগণের সেবক হিসেবে প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করতে হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আমলাতন্ত্রকে কীভাবে জনগণের কাছাকাছি আনা যায়, তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে তারই একটি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শেষ পর্যন্ত, একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই যে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিকতার যে সংমিশ্রণের কথা তিনি বলেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের সুশাসন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

