জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে বিদেশের মাটিতে সংহতি জানাতে গিয়ে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ২০৮ জন প্রবাসীকে কেন ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। দেশের ক্রান্তিলগ্নে প্রবাসীদের এই আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন ও তাদের পুনর্বাসনের দাবিতে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত আজ এই আদেশ দেন।
সোমবার বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। প্রবাসীদের প্রতি অমানবিক আচরণের বিচার এবং তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালতের এই হস্তক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।
আদালত এই বিষয়ে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।
শুনানি শেষে ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানান, এই ২০৮ জন প্রবাসীর তালিকায় এমন ৫৭ জন শ্রমিক রয়েছেন যারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘ মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। প্রবাসে কঠোর আইনের মধ্যেও তারা নিজ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা সেখানে কেবল কারাবাসই করেননি, অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তারা মুক্তি পান এবং দেশে ফিরে আসেন। সরকার ইতোমধ্যে এই সাহসী প্রবাসীদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করেছে। তবে এই যোদ্ধারা দেশে ফিরে জীবন ও জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আইনজীবীদের মতে, প্রবাসীরা যখন প্রবাসে সাজা ভোগ করে দেশে ফিরে আসেন, তখন তাদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রের বড় দায়বদ্ধতা থাকে। রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও যখন তারা দেশের প্রয়োজনে সর্বস্ব হারান, তখন তাদের এককালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান করা আইনি ও নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণে প্রবাসীদের জীবন সংগ্রাম ও তাদের আত্মত্যাগের বিষয়টি জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে ব্যারিস্টার সানজিদ বলেন, “এই যোদ্ধারা আমাদের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতাও বটে।”
জুলাই আন্দোলনের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যখন দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন ছিল এবং সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চলছিল, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশের রাজপথে প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেখানে সভা-সমাবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, সেখানেও তারা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।
আমিরাতের সেই ৫৭ জন শ্রমিকের ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাদের কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তারা পিছপা হননি। পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশে ফিরে আসলে তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তবে সেই আবেগের জোয়ার কেটে যাওয়ার পর বর্তমানে তারা কর্মহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অনেকের পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত। প্রবাসে থাকার সময় তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়ে যারা চলতেন, আজ তারা নিঃস্ব। মূলত এই মানবিক বিপর্যয় ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পূর্ণতা দিতেই ক্ষতিপূরণের এই দাবি তোলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, ২৫ লাখ টাকার এই আর্থিক সহায়তা তাদের জীবনকে পুনরায় গুছিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে টাটকা। আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের মতো প্রবাসীরাও যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জীবন বাজি রেখেছিলেন, হাইকোর্টের আজকের এই রুল সেই ইতিহাসেরই একটি আইনি স্বীকৃতি। যারা বিদেশের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে বা কারাদণ্ডের ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশের কথা ভেবেছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের এই ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া এখন আইনি লড়াইয়ের মুখে।
এদিকে মানবাধিকার কর্মীরা আদালতের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, কেবল মৌখিক স্বীকৃতি নয়, বরং আর্থিক পুনর্বাসনই পারে এই যোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান দিতে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টি নিশ্চিত না করতে পারলে ভবিষ্যতে জাতীয় সংকটে প্রবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করেন অনেকে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ইতোমধ্যেই ফিরে আসা প্রবাসীদের ডাটাবেজ তৈরি করছে এবং তাদের কর্মসংস্থানের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আদালতের এই নির্দিষ্ট রুল জারির পর এখন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সরকারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই গণআন্দোলন কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিদেশের কনস্যুলেটগুলোর সামনে প্রবাসীদের ক্ষোভের যে স্ফুলিঙ্গ দেখা গিয়েছিল, তা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। সেই উত্তাল সময়ে অনেক প্রবাসী তাদের বৈধ ভিসা হারিয়েছেন, অনেককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
হাইকোর্টের রুলের পর এখন দেখার বিষয় সরকার এই বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ কীভাবে সমন্বয় করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। রুলের জবাব দাখিলের পর পরবর্তী শুনানিতে এই প্রবাসীদের ভাগ্যের চূড়ান্ত ফয়সালা হতে পারে।
প্রবাসীরা আশা করছেন, আদালত ও সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তারা তাদের হারানো দিনগুলোর ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবেন। তাদের আত্মত্যাগ যেন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবেও তারা মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে নিজ দেশে বসবাস করতে পারেন—এটাই এখন সাধারণ মানুষের চাওয়া।
জুলাই যোদ্ধাদের এই আইনি লড়াই কেবল ক্ষতিপূরণের জন্য নয়, বরং এটি তাদের সাহসিকতার প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের এক দাবি। আগামী দিনগুলোতে এই মামলার শুনানি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বিশেষ নজির হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত ২০৮ জন প্রবাসী তাদের পাওনা অধিকার বুঝে পাবেন কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে হাইকোর্টের এই রুল জারির ঘটনাটি নিঃসন্দেহে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশাপাশি প্রবাসীদের মধ্যেও নতুন আশা জাগিয়েছে। দেশের জন্য জীবন ও যৌবন বিলিয়ে দেওয়া এই যোদ্ধাদের পাশে রাষ্ট্র কতটুকু দাঁড়াতে পারে, সেটাই এখন বড় পরীক্ষা।

