সিলেটের আকাশ আজ যেন একটু বেশিই নীল, আর সেই নীলের নিচে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা মেতেছে তারুণ্যের উৎসবে। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি হাজারো মানুষের করতালির মধ্য দিয়ে প্রবেশ করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্দেশ্য—বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল ক্রীড়াঙ্গনকে জাগিয়ে তোলার এক উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।
মাঠের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ঘোষণা করলেন, তখন সময় বিকেল ৫টা ৮ মিনিট। কেবল সিলেট নয়, ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হলো দেশের প্রতিটি জেলা স্টেডিয়ামে অপেক্ষমান কয়েক হাজার খুদে অ্যাথলেট। কয়েক দশক আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানটি যেভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, আজ যেন সেই একই আবেগকে ফিরিয়ে আনা হলো খেলার মাঠে। তবে এবার লক্ষ্য গান বা নাচ নয়, বরং সবুজ মাঠ থেকে আগামীর মেসি কিংবা সাকিবদের খুঁজে বের করা।
স্টেডিয়ামের চারপাশ আজ ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা, কিন্তু সেই কঠোরতার মাঝেও ছিল এক উৎসবমুখর আমেজ। মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা খুদে ক্রীড়াবিদদের চোখেমুখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন। তাদের উৎসাহ দিতে ঢাকা থেকে উড়ে এসেছেন দেশের ৩২ জন কিংবদন্তি ও বর্তমান তারকা খেলোয়াড়। ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা কাবাডি—প্রতিটি ডিসিপ্লিনের এই আইকনরা আজ এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন। তারা কেবল সাক্ষী হতে আসেননি, তারা এসেছেন এই প্রকল্পের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে, যাতে নিভৃত পল্লীর কোনো এক কিশোর তার নায়ককে সামনে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারে।
এই আয়োজনের প্রেক্ষাপট বেশ গভীর। গত জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের ইশতেহারে একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল ক্রীড়াকে কেবল বিনোদন নয়, বরং পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আজকের এই উদ্বোধন সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রথম বাস্তব প্রতিফলন। সরকার ইতিমধ্যে খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ‘ক্রীড়া কার্ড’ ও ভাতার ব্যবস্থা করেছে, যা আর্থিক সংকটে থাকা উদীয়মান প্রতিভাদের জন্য বড় এক আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিলেটের এই ভেন্যু নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাধারণত সব বড় আয়োজন ঢাকা থেকেই শুরু হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন এই ধারার পরিবর্তন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, “আমাকে ঢাকায় আটকে রেখো না, ঢাকার বাইরে যাও।” তৃণমূলের প্রতি এই যে মমত্ববোধ, তারই প্রতিফলন হিসেবে আজ চায়ের দেশ সিলেট থেকে শুরু হলো এই মহাযজ্ঞ।
প্রতিযোগিতার কাঠামোটি সাজানো হয়েছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা এতে অংশ নিচ্ছে। মোট আটটি জনপ্রিয় ইভেন্টে চলবে এই লড়াই। প্রথমে উপজেলা পর্যায় থেকে মেধা যাচাই শুরু হবে, এরপর জেলা ও বিভাগ হয়ে সেরারা পৌঁছাবে জাতীয় পর্যায়ে। ১৩ মে থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক পর্যায়ের এই লড়াই চলবে ২২ মে পর্যন্ত। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে প্রশাসন ও বাস্তবায়ন কমিটি প্রতিটি ধাপে কড়া নজরদারি রাখছে।
পুরো বাংলাদেশকে মোট ১০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে শুরু করে রাজশাহী ও ময়মনসিংহ—সবগুলো অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে এই মানচিত্র। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টনের মতো দলগত খেলায় থাকছে নকআউট পদ্ধতি। আর দাবার মতো বুদ্ধিভিত্তিক লড়াইয়ে অনুসরণ করা হবে আন্তর্জাতিক ‘সুইস লিগ’ পদ্ধতি। অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতারে হিট এবং ফাইনাল রাউন্ডের মাধ্যমে সেরাদের বেছে নেওয়া হবে।
অংশগ্রহণের পরিসংখ্যানটি বেশ চমকপ্রদ। নিবন্ধনের জন্য সময় ছিল মাত্র ১৫ দিন, কিন্তু এরই মধ্যে রেকর্ড গড়েছে সারা দেশের শিশু-কিশোররা। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৯৩। এর মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ৯৪৯ এবং মেয়েদের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৭৪৪। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি ২৫ হাজার ৩৮৭ জন নিবন্ধন করেছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সাড়া মিলেছে তুলনামূলক কম, প্রায় ৮ হাজার। তবে আয়োজকরা আশাবাদী, মাঠের লড়াই শুরু হলে এই জোয়ার সবখানে ছড়িয়ে পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী যখন স্টেডিয়াম ছাড়ছিলেন, তখনো গ্যালারিতে উদ্দীপনা কমেনি। এই ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির খোলনলচে বদলে দেওয়ার এক নীরব বিপ্লব। সিলেটের মাঠ থেকে যে চারা আজ রোপণ করা হলো, তা ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকাকে কতটা উঁচুতে নিয়ে যাবে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।
সরকারের এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আর প্রতিভার অভাব হবে না। মাঠের প্রতিটি কোণ থেকে উঠে আসবে নতুন প্রাণ, যারা বিশ্বকে জানিয়ে দেবে—বাংলাদেশ কেবল লড়তে জানে না, জয় করতেও জানে। আজকের এই বিকেলটি তাই কেবল একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে রইল না, এটি হয়ে থাকল বাংলাদেশের আগামীর চ্যাম্পিয়নদের আঁতুড়ঘর।

