রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে একদম তৃণমূল পর্যন্ত সেবার মান পৌঁছে দেওয়ার প্রধান কারিগর হলেন জেলা প্রশাসকরা। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা যেসব বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তা সরাসরি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম হলো ‘ডিসি সম্মেলন’। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনটি আগামীকাল রোববার (৩ মে) থেকে শুরু হতে যাচ্ছে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সকাল সাড়ে ১০টায় এই চার দিনব্যাপী সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবারের সম্মেলন কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নতুন বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কার ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড শক্তিশালী করা এবং নাগরিক ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যেই সাজানো হয়েছে এবারের সব আয়োজন।
শনিবার বিকেলে সচিবালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির এই সম্মেলনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এবারের সম্মেলন গতবারের তুলনায় একদিন বাড়িয়ে চার দিন করা হয়েছে, যা প্রশাসনের কাজের পরিধি ও গুরুত্ব বৃদ্ধিরই প্রতিফলন।
মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনাররা তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মোট ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে ৪৯৮টি চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের মূল ফোকাস এখন জনসেবা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব এসেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে, যার সংখ্যা ৪৪টি। গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসার সরঞ্জাম নিশ্চিত করার বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। জেলা প্রশাসকরা সরাসরি মন্ত্রীদের কাছে তাদের জেলার সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরবেন। অনেক ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে যেসব কাজ আটকে থাকে, এই সম্মেলনে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তার তাৎক্ষণিক সমাধান আসার সম্ভাবনা থাকে।
এবারের সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। সাধারণ মানুষ যেন ভূমি অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার না হয় এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেন জমির সব কাজ শেষ করা যায়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর কৌশলী পরিকল্পনা নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়টিও তালিকার শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তী সময়ে মাঠ পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা আরও সুনির্দিষ্ট করা হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ কার্যক্রম যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও থাকবে কড়া বার্তা।
সম্মেলনের চার দিনের কর্মব্যস্ত সূচিতে কেবল সরকারের সঙ্গেই নয়, বরং রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভের সঙ্গেও জেলা প্রশাসকদের নিবিড় মতবিনিময় হবে। সূচি অনুযায়ী ৩ মে সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি এবং ৪ মে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তারা। ৫ মে সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দিকনির্দেশনা গ্রহণের কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
বিচার বিভাগ এবং আইনসভার সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের এই সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতে করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনি জ্ঞান এবং সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়। এছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাথে পৃথক কার্য-অধিবেশন রয়েছে, যেখানে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।
মোট ৩৪টি সেশনের মধ্যে ৩০টিই হবে মূল কার্য-অধিবেশন। এসব অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সিনিয়র সচিবরা উপস্থিত থাকবেন। জেলা প্রশাসকরা সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবেন এবং তাদের জেলার বিশেষ কোনো সম্ভাবনা যেমন—পর্যটন বিকাশ কিংবা ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের বিষয়ে বাজেট ও প্রশাসনিক সহায়তা চাইতে পারবেন।
অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবিরের মতে, এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে মাঠ পর্যায়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা। অনেক সময় দেখা যায়, কেন্দ্রে বসে যেসব নীতি প্রণয়ন করা হয়, তৃণমূলের ভৌগোলিক বা সামাজিক বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে সেই নীতিনির্ধারণী গ্যাপগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সঠিক বণ্টন এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসিদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো কোনো যোগ্য মানুষ যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়। দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের নৈতিক অবস্থান ও সততার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দূষণ রোধে জেলা প্রশাসকদের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়েও সম্মেলনে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। বিশেষ করে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদী দখল এবং বন উজাড় রোধে মাঠ পর্যায়ে কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হবে। ভৌত অবকাঠামো বিশেষ করে রাস্তাঘাট ও ব্রিজের কাজ সময়মতো শেষ হচ্ছে কি না, তা সরাসরি মনিটরিং করার দায়িত্ব ডিসিদের ওপর আরও জোরালোভাবে অর্পণ করা হতে পারে।
এই সম্মেলন চলাকালীন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের একটি বিশেষ সভাও অনুষ্ঠিত হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায় মনে করে, একটি গতিশীল এবং সাহসী আমলাতন্ত্র ছাড়া কোনো বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
আগামী ৬ মে বুধবার সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে চার দিনের এই কর্মযজ্ঞ। সম্মেলন শেষে জেলা প্রশাসকরা যখন নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন, তখন তাদের হাতে থাকবে সরকারের আগামী এক বছরের কর্মপরিকল্পনার একটি স্বচ্ছ ম্যাপ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই সম্মেলনের পর ডিসি অফিসগুলোতে সেবার মান বাড়বে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পাবে।
সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত সমন্বয়ের এই বিশাল উদ্যোগ সফল হলে তার সুফল সরাসরি পাবে দেশের সাধারণ মানুষ। ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে প্রত্যয় সরকার ব্যক্ত করেছে, তা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তার একটি দিকনির্দেশনা মিলবে কালকের উদ্বোধনী ভাষণেই।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের সাথে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন। এই সেশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে প্রটোকলের বাইরে গিয়ে জেলা প্রশাসকরা তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলতে পারেন। সংবাদপত্রের শিরোনামে কাল ডিসি সম্মেলনের খবরটি থাকলেও, এর মূল প্রভাব অনুভূত হবে সারা দেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নাগরিক সেবার গুণগত পরিবর্তনে।
প্রশাসনের এই বিশাল সম্মেলনে রাজধানীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন এলাকায় যান চলাচল কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে। মাঠ প্রশাসনের এই মিলনমেলা থেকে শেষ পর্যন্ত কী কী বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে সারা দেশ।

