সিলেটের সুরমা তীরের নির্মল বাতাস আর উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য খাতের এক নতুন রূপরেখা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল শহরকেন্দ্রিক চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার দুপুরে সিলেট নগর ভবনে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, দেশে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করছে সরকার। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হবে এর জেন্ডার ব্যালেন্স; যেখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের অন্তত ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান শূন্যতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগগুলো এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ এখনো আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সুফল থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তারেক রহমানের মতে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়—এই সনাতন আদর্শকে ভিত্তি করেই সাজানো হচ্ছে নতুন এই স্বাস্থ্য প্রকল্প। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসার আগেই যদি তাদের রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তবে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
নতুন নিয়োগ পেতে যাওয়া এই বিশাল স্বাস্থ্যবাহিনী সরাসরি মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কাজ করবে। তাদের মূল দায়িত্ব হবে নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং সাধারণ রোগবালাই সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা বিপ্লব ঘটাতে পারেন বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন।
কিডনি রোগ থেকে শুরু করে হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যাগুলো এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, যদি শুরুতেই সচেতনতা তৈরি করা যায় যে কোন খাবারে ঝুঁকি বাড়ে আর কোন অভ্যাসে শরীর সুস্থ থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যখন অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমে আসবে, তখন আমাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার মান বাড়ানো সহজ হবে। ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে বেশি সময় দিতে পারবেন এবং সেবার মানও অনেক উন্নত হবে।” এটি মূলত একটি সুস্থ ও নিরোগ জাতি গঠনের সুদূরপ্রসারী কৌশল।
কেবল স্বাস্থ্য খাত নয়, দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়েও নিজের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব রাষ্ট্রীয় কলকারখানা দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ পড়ে আছে, সেগুলো পুনরায় সচল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সরকার।
শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে সরকার এখন ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, রাষ্ট্রীয় কলকারখানাগুলো প্রয়োজনে বেসরকারীকরণ করা হবে। যারা এসব খাতে অভিজ্ঞ এবং আগ্রহী, তাদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হবে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিও তিনি বিশেষ আহ্বান জানান। দেশের মাটিতে পুঁজি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী এবং দেশি বিনিয়োগকারীদের যৌথ প্রচেষ্টায় দেশের বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, দেশে বিদ্যমান ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা হচ্ছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণরা যেন কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং বিদেশের শ্রমবাজারেও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরের শুরুটা ছিল বেশ ছিমছাম ও প্রটোকলমুক্ত। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। সাধারণ যাত্রীদের মতোই তার এই যাত্রা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সকাল ১০টায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
সিলেটের স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিমানবন্দর এলাকাটি ছিল সরগরম। সেখান থেকে তিনি সরাসরি চলে যান সুরমা নদীর তীরে। সিলেটের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সুরমা নদীর সৌন্দর্যবর্ধন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ। প্রধানমন্ত্রী আজ সেই প্রকল্পেরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
সুরমা নদীর উভয় তীরের উন্নয়ন এবং টেকসই বন্যা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের এই প্রকল্প সিলেটের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে প্রধানমন্ত্রী নগর ভবনের সমাবেশে যোগ দেন, যেখানে তিনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতের এই মহাপরিকল্পনার কথা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে সিলেটের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় নারী সমাজ ও সচেতন মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। এটি নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের এই ঘোষণা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য কাঠামোকে আমূল বদলে দেওয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ। যদি এই পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সূচকে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য—এই দুই মৌলিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই স্পষ্ট অবস্থান মূলত একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং ভোকেশনাল ট্রেনিংকে কার্যকর করার উদ্যোগগুলো আগামী দিনগুলোতে দেশের যুবসমাজের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিতে পারে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় নেতাদের জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং তাদের সেবাই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল ব্রত। সিলেটের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুত শেষ হয়, সে বিষয়েও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
সিলেটের আকাশ আজ রৌদ্রোজ্জ্বল থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ও ঘোষণা যেন গোটা দেশের স্বাস্থ্য ও শিল্প খাতের জন্য এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি হয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বাস্তবায়ন কত দ্রুত মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান হয়।
জনগণের প্রত্যাশা, ঘোষিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে। এক লাখ নতুন কর্মীর হাত ধরে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘর যেন হয়ে ওঠে রোগমুক্ত ও সচেতন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ভিশন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে নতুন বাংলাদেশের পথচলা আরও সুসংহত হবে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিকেলে সিলেট সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পুনরায় ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। তবে তার রেখে যাওয়া এই ঘোষণাগুলো আগামী বেশ কিছু দিন দেশের রাজনীতির মাঠ এবং চায়ের টেবিলে আলোচনার প্রধান খোরাক হয়ে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

