ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চিরাচরিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম বানাতে চায় না। বরং প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও আদর্শ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বুদ্ধ পূর্ণিমাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য পরে তার ডেপুটি প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
বৌদ্ধ ধর্মের মূল দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মহামতি গৌতম বুদ্ধের ‘পঞ্চশীল নীতি’র গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের জন্য যে পাঁচটি জীবনদর্শন দিয়ে গেছেন—প্রাণী হত্যা না করা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা ও মাদক থেকে বিরত থাকা—তা কেবল বৌদ্ধদের জন্য নয়, বরং প্রতিটি সুস্থ ও মানবিক সমাজের ভিত্তি হতে পারে।
তারেক রহমানের মতে, অহিংসা, প্রেম এবং প্রতিটি জীবের প্রতি করুণা প্রদর্শনের যে শিক্ষা বৌদ্ধ ধর্মে রয়েছে, তা বর্তমান বিশ্বের অস্থির সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি নিজ নিজ ধর্মের মূল ও ইতিবাচক শিক্ষাগুলো রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে অনুসরণ করেন, তবে একটি সত্যিকার অর্থেই মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণ করাই আমাদের সরকারের প্রধান অঙ্গীকার, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বিনা বাধায় নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করতে পারবে। নাগরিকের অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন রাখা হবে না।
ধর্মীয় সহাবস্থান নিয়ে নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা অতীতেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করিনি, ভবিষ্যতেও করতে চাই না।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।” এই নীতিই বর্তমান প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীনের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন, তখন তারা কে কোন ধর্মের বা কে বিশ্বাসী আর কে অবিশ্বাসী—তা বিচার করেননি। লাখো শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি সবার। এখানে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিভেদ থাকতে পারে না।
তারেক রহমান উপস্থিত বৌদ্ধ নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ আপনার, আমার এবং আমাদের সবার। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এই ভূখণ্ডে প্রতিটি মানুষের সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই দেশের আলো-বাতাস আর মাটির ওপর সবার সমান অধিকার। তাই হীনম্মন্যতায় ভোগার কোনো অবকাশ নেই।
বৌদ্ধ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দর্শনের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই রাজনৈতিক দর্শনটি কেবল একটি তাত্ত্বিক কথা নয়, এটি দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর নিবিড় সহাবস্থান নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদই সব বৈচিত্র্যকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, “আপনারা কেউ নিজেদের কখনোই সংখ্যালঘু ভাববেন না। রাষ্ট্র আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা প্রত্যেকেই এই দেশের নাগরিক—আমরা সবাই বাংলাদেশি।” এই পরিচয়ই অন্য সব বিভেদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বিগত বছরগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা সরকার কঠোর হাতে দমন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বজায় রাখতে তার প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি কেবল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধেও সমভাবে প্রযোজ্য।
বৌদ্ধ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর এই অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা জানান, ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সরকারের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তরিক সহযোগিতা তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও সমতলের বৌদ্ধ জনপদগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আসন্ন উৎসবের সাফল্য কামনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গৌতম বুদ্ধের শান্তি ও মৈত্রীর বাণী কেবল বৌদ্ধ সমাজে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পেলে দেশ দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
সচিবালয়ের এই বৈঠকটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল না, বরং এটি ছিল সরকারের ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মনে নিরাপত্তা ও স্বীকৃতির এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ধর্মকে ব্যবহার করা একটি আত্মঘাতী পথ। তার সরকারের লক্ষ্য হলো একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে তার মেধা ও দেশপ্রেম দিয়ে, তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়।
বিকেলে প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় ডেপুটি প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যাতে বুদ্ধ পূর্ণিমার সময় সারাদেশে উৎসবের পরিবেশ বজায় থাকে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই আলোচনার মধ্য দিয়ে এটি আবারও স্পষ্ট হলো যে, বাংলাদেশের সামাজিক বুনন রক্ষায় ধর্মীয় সম্প্রীতিই প্রধান স্তম্ভ। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণই প্রধানমন্ত্রীর মূল স্বপ্ন, যা তিনি তার প্রতিটি কাজে প্রমাণ করতে সচেষ্ট।
সবশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা নিজ নিজ উপাসনালয় থেকে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। ঘৃণা নয়, ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব—এই বার্তাই ছিল আজকের অনুষ্ঠানের মূল নির্যাস।

