দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর এক বিশেষ গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আগামী মে মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকারের জোরালো পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশের টিকাদান কর্মসূচি ও আসন্ন বর্ষার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিশুদের সুরক্ষা আমাদের কাছে সবার আগে। আমরা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি যে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসব। এই কার্যক্রম সফল করতে মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬১ শতাংশ শিশুকে সফলভাবে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। অনেক দুর্গম এলাকাতেও আমাদের কর্মীরা পৌঁছে গেছেন এবং সেখানে শতভাগ কভারেজ অর্জিত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক বড় সাফল্য।
হামের প্রকোপ কমে আসার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথম ধাপে যে ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল, বর্তমানে সেখানে নতুন কোনো হামের রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে টিকা প্রদান করলে যেকোনো মহামারি বা প্রাদুর্ভাব রুখে দেওয়া সম্ভব।
সরকার এবার টিকার জন্য প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে দ্রুত কাজ করেছে। মন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক সরবরাহ থেকে টিকা হাতে পাওয়ার পর নির্ধারিত সূচির জন্য আর অপেক্ষা করা হয়নি। ৫ মে থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও ১৪ দিন এগিয়ে ২০ এপ্রিল থেকেই কাজ শুরু হয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ছয়টি বছর শিশুদের হামের কোনো নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়নি। এই দীর্ঘ বিরতি আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে এই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছি।
এই সংকটকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব স্বীকার করে তিনি বলেন, ইউনিসেফ, গ্যাভি, বিশ্বব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নয়ন সহযোগীরা যদি এগিয়ে না আসত, তবে আজ আমাদের দেশের মানচিত্র ও স্বাস্থ্য চিত্র হয়তো অন্যরকম হতে পারত। তাদের সহায়তা আমাদের এই যুদ্ধে বড় শক্তি জুগিয়েছে।
আলাপকালে বর্ষা মৌসুমের আতঙ্ক ‘ডেঙ্গু’ নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, এবার আগেভাগেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে প্রয়োজনে অস্থায়ী তাঁবুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ১ মে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠগুলোতে তাঁবু স্থাপনের কাজ শুরু হবে।
তবে মন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল কিছুটা উদ্বেগের সুর। তিনি বলেন, আমরা সেবা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু প্রতিরোধ করাটা তার চেয়েও বেশি জরুরি। আমরা চাই না মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসুক। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে সিটি করপোরেশনের ভূমিকার দিকেও ইঙ্গিত করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বাসাবাড়ি ও উন্মুক্ত স্থানে মশা নিধনে যাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু মুক্ত হওয়া অসম্ভব।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে মন্ত্রী চিকিৎসকদের কাজের মান এবং রোগীদের সেবার পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে যক্ষ্মা বা টিবি রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেনের এই আশাবাদ দেশের সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মে মাসকে কেন্দ্র করে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের কয়েক কোটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
পরিশেষে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে আমরা কাজ করছি। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। এই যাত্রায় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের এই তৎপরতা আগামী দিনগুলোতে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নে এর প্রতিফলন কতটুকু ঘটে।

