রাজধানী ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পর্যায়ক্রমিকভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরো দেশকে একটি সুষম কাঠামোর আওতায় আনাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম কার্যদিবসে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই মহাপরিকল্পনার কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান দেশের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বীকার করে নেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সব সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার কারণেই সাধারণ মানুষ রাজধানীতে ভিড় জমাতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলেন, “এটি কোনো একদিনের সমস্যা নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে এভাবেই আমাদের ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এতদিন সারা দেশে সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিনি।”
তারেক রহমান বলেন, মানুষ মূলত ভালো চাকরি, মানসম্মত শিক্ষা এবং উন্নত চিকিৎসার টানেই ঢাকামুখী হয়। সেই স্রোত ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো এই সুবিধাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যাতে ঢাকার বাইরেও আধুনিক নাগরিক জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়।
সংসদ সদস্য আবুল কালাম তার প্রশ্নে ঢাকার জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনস্রোত কমাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ রয়েছে কি না।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রাজধানীর ওপর থেকে চাপ কমানোর বিষয়টি একটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমরা এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং মানুষকে আর চাকরির খোঁজে ঢাকা আসতে হবে না।”
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের যাতে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে না হয়, সেজন্য জেলা পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ চলছে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করার ওপর সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তার মতে, যখন একজন অভিভাবক তার নিজের এলাকাতেই সন্তানের সুশিক্ষা এবং পরিবারের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবেন, তখন তারা আর জরাজীর্ণ ঢাকা শহরে এসে ভিড় করবেন না। এই স্বতঃস্ফূর্ত বিকেন্দ্রীকরণই ঢাকাকে একদিন একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করবে।
অধিবেশন চলাকালে সংসদ কক্ষে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানান। বিশেষ করে ঢাকার চিরচেনা যানজট এবং আবাসন সংকট নিরসনে এই বিকেন্দ্রীকরণ নীতিকে একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ এবং মফস্বল শহরগুলোর আধুনিকায়নের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দেশের প্রতিটি অংশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ঢাকার ওপর থেকে জনমানুষের বাড়তি চাপ দৃশ্যমানভাবে কমতে শুরু করবে।
একই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, সরকার কেবল অবকাঠামো নয়, বরং নাগরিক সেবা ডিজিটালাইজ করার মাধ্যমেও বিকেন্দ্রীকরণকে ত্বরান্বিত করছে। ফলে ছোটখাটো কাজের জন্য এখন আর সাধারণ মানুষকে সচিবালয়ে দৌড়াতে হচ্ছে না।
সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মন্তব্য করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি স্বীকারোক্তি এবং সমাধানের রোডম্যাপ জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে উন্নয়নের সুফল যখন তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করবে, তখন সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই প্রথম অধিবেশনটি শুরু থেকেই নানা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আজকের এই ঘোষণা সেই ধারাবাহিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করল। ঢাকার নাগরিকরা এখন দীর্ঘদিনের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র মতে, এই বিকেন্দ্রীকরণ প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু জেলায় কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কাজ চলছে। রেল এবং সড়কপথের আধুনিকায়ন সম্পন্ন হলে ঢাকার বাইরে শিল্প কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষে বলেন, একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পায়। আমরা সেই সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে মানুষের পরিচয় তার এলাকা দিয়ে হবে না, হবে তার যোগ্যতা দিয়ে। আর সেই যোগ্যতার বিকাশের সুযোগ থাকবে দেশের প্রতিটি প্রান্তে।
বুধবারের এই অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সম্পূরক প্রশ্নকারী সংসদ সদস্য এবং জবাবদাতা প্রধানমন্ত্রী—উভয়কেই ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন। তবে আজকের এই আলোচনার রেশ সংসদের বাইরেও সাধারণ মানুষের মনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে যে ঢাকাকে ছাড়তে হবে—প্রধানমন্ত্রীর এই সারগর্ভ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আগামীর নগর পরিকল্পনার এক নতুন চিত্র ফুটে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, এই দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কতটা গতি সঞ্চার হয়।
রাজধানীর বাসিন্দারাও মনে করছেন, কেবল মেগা প্রজেক্ট দিয়ে ঢাকাকে রক্ষা করা সম্ভব নয় যদি না মানুষকে বাইরে থাকার সুযোগ করে দেওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক আশ্বাস নয়, বরং সময়ের এক অপরিহার্য দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

