আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। নির্বাচন পূর্ববর্তী এই সহিংস ঘটনায় তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর, ২০২৫) দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণাকালে এক বর্বরোচিত হামলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতালে নিয়ে আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ রাজধানীর বিজয়নগর এলাকার কালভার্ট রোড দিয়ে রিকশায় করে যাওয়ার সময় দুজন অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় গুলিতে তাঁর বাম কানের নিচে আঘাত লাগে এবং দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
হামলার শিকার হওয়ার পরপরই তাঁকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন যে, যখন তাঁকে জরুরি বিভাগে আনা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁকে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দেওয়া হয়। ডাক্তার আহমেদ আরও জানান, “তাঁর মাথার অভ্যন্তরে এখনও গুলি রয়েছে এবং কানের পাশে গুলি লেগেছে। বর্তমানে তাঁর রক্তচাপ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সামগ্রিকভাবে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।”
এদিকে, শরিফ ওসমান হাদির অফিসিয়াল ফেসবুক পাতা থেকে তাঁর অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা এই নেতার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ‘বি’ নেগেটিভ রক্ত সরবরাহের আবেদন জানানো হয়েছে। যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতালের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি।
এই হামলার ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে বিজয়নগর এলাকায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা হয়নি, ঘটনাস্থলে আমাদের বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। তাদের নিশ্চিতকরণের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে।”
গুলিবিদ্ধ হাদিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা তাঁর সঙ্গী মিসবাহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, জুমার নামাজ শেষে তিনি (শরিফ ওসমান হাদি) মতিঝিল-বিজয়নগর কালভার্ট এলাকা দিয়ে রিকশায় যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মোটরসাইকেলে আসা দুজন ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। মিসবাহ আরও যোগ করেন, চিকিৎসক জানিয়েছেন अत्यधिक রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর অবস্থা গুরুতর। বর্তমানে শরিফ ওসমান হাদি ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
‘জুলাই ঐক্য’-এর অন্যতম সংগঠক ইস্রাফিল ফরায়েজী দাবি করেন, এই হামলা নির্বাচনী প্রচারণাকালে করা হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
শরিফ ওসমান হাদি শুধু ঢাকা-৮ আসনের একজন সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীই নন, তিনি গণজাগরণমূলক সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ একজন পরিচিত মুখপাত্র। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ধরনের হামলা স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত মাস (নভেম্বর) থেকেই শরিফ ওসমান হাদি তাঁর জীবন নিয়ে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছিলেন। ১৪ নভেম্বর তাঁর ফেসবুক পাতায় দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিজেই এই তথ্য জানান। তিনি লিখেছিলেন যে, দেশি ও বিদেশি প্রায় ৩০টি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি, তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের হুমকি এবং তাঁর মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তাঁর সেই পোস্টে তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছিলেন, “গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সারসংক্ষেপ হলো—আমাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।”
এই পূর্ববর্তী হুমকি এবং নির্বাচনের ঠিক পূর্বে ঘটে যাওয়া এই আক্রমণ—উভয় ঘটনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণের মনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এটি কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ বজায় রাখতে এই ধরনের হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
শরিফ ওসমান হাদির উপর এই হামলা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই গুরুতর ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।

