মঙ্গলবার ভোরের আলো যখন কেবল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় এলাকা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতি এলাকায় একটি যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। নিহতরা সবাই ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সদস্য বলে জানা গেছে।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে চুনতির জাঙ্গালিয়া চেকপোস্ট সংলগ্ন এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনাটি ঘটে। দ্রুতগামী মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে সড়কের পাশের একটি গাছে সজোরে ধাক্কা খায় এবং মুহূর্তেই গভীর খাদে ছিটকে পড়ে। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে হতাহতদের উদ্ধারে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল জলিল দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কালো রঙের ওই মাইক্রোবাসটি কক্সবাজার থেকে যাত্রী নিয়ে খাগড়াছড়ির দিকে যাচ্ছিল। পথে চুনতি এলাকায় পৌঁছালে চালক সম্ভবত নিয়ন্ত্রণ হারান। সড়কের বাঁক ঘোরার সময় গাড়িটি সরাসরি রাস্তার নিচের নিচু জমিতে পড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শব্দ শুনে তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন মাইক্রোবাসটি উল্টে ছিল। ভেতর থেকে আর্তচিৎকার আসছিল। স্থানীয়রা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তবে ঘটনাস্থলেই তিনজনের দেহ নিথর হয়ে পড়ে ছিল।
লোহাগাড়া ফায়ার স্টেশনের সাব-অফিসার ফিরোজ খান বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আমরা গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করি। তবে আমরা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা আহত পাঁচজনকে উদ্ধার করে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
এখন পর্যন্ত নিহতদের সুনির্দিষ্ট নাম-পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তারা খাগড়াছড়ি বা পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সদস্য। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি উদ্ধারে কাজ চলছে এবং এই ঘটনায় লোহাগাড়া থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মহাসড়কের এই অংশে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা বলছেন, চুনতির এই বাঁকটি অনেক সময় চালকদের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দ্রুতগতির গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ রাখতে হিমশিম খায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত পাঁচজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বজনদের সন্ধানে পুলিশ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে যোগাযোগ শুরু করেছে।
রাস্তার ওপর পড়ে থাকা রক্তের দাগ আর দুমড়ানো লোহার স্তূপ দেখে শিউরে উঠছিলেন পথচারীরা। খাগড়াছড়ির উদ্দেশে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষগুলো যে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিথর দেহে ফিরবেন, তা কেউ ভাবতেও পারেননি। পুরো এলাকায় এখন শোকের ছায়া বিরাজ করছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নিরাপত্তা এবং বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। নিছক দুর্ঘটনা নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সড়ক যেন আর কোনো পরিবারের স্বপ্ন কেড়ে না নেয়, এখন এটাই সবার চাওয়া।

