দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যকার বিদ্যুতের বৈষম্য কমিয়ে আনতে এক সাহসী ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সেচ মৌসুমে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন থেকে রাজধানী ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আজ জাতীয় সংসদে এই পরিকল্পনার কথা জানান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশে’ গ্রাম ও শহরের মানুষকে সমানভাবে সংকটের ভাগীদার হতে হবে। কেবল গ্রামের মানুষ অন্ধাকারে থাকবে আর শহর আলোকোজ্জ্বল হবে—এমন নীতিতে বর্তমান সরকার বিশ্বাসী নয়।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার বক্তব্যে স্বীকার করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ খাত আজ এই নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বিগত সরকারের আমলের তথ্যের গরমিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাগজে-কলমে যে বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবতার সাথে তার কোনো মিল নেই। বর্তমান সংকট সেই ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ ভুল নীতিরই ফসল।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, বুধবার দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে পুরো দেশে ২ হাজার মেগাওয়াটের ওপর লোডশেডিং করতে হয়েছে। এই বিশাল ঘাটতির চাপ এখন ঢাকার মানুষের সাথে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে পাম্পগুলো চালু রেখে কৃষকের ফসল রক্ষা করা যায়।
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের লোডশেডিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে ডিজেল ও বিদ্যুতের অভাবে কোনো কৃষকের সেচ কাজ ব্যাহত না হয়। ধান কাটার এই মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই সরকার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
গ্যাস সংকটের বিষয়েও প্রতিমন্ত্রী সংসদে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি জানান, দেশে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। যদিও সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় গ্যাস আমদানির অর্থ রয়েছে, কিন্তু পূর্ববর্তী সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা টার্মিনাল তৈরি না করায় দ্রুত আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নতির কাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বর্তমানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কেন আরও খারাপ হলো, তার ব্যাখ্যায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি আমদানিকৃত পাওয়ার প্লান্ট এবং একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। এই দুটি কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরলে আগামী সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি অনেক বেশি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। জনগণের এই সাময়িক কষ্টের জন্য তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংসদ অধিবেশনে প্রতিমন্ত্রী যখন এই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে বৈষম্য দূর করার বিষয়ে তার যুক্তিটি অনেকেই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং জনগণের আস্থা অর্জনে তারা সত্য তথ্যই দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবে।
ঢাকার মানুষের জন্য এই ঘোষণা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এটিকে একটি প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সেচ মৌসুমে সঠিক সময়ে বিদ্যুৎ না পেলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। রাজধানীর লোডশেডিং সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
বিবৃতির শেষে প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের জট খুলতে একটু সময় লাগবে। তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন শুরু হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসবে। আপাতত কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে ঢাকার বাসিন্দাদের এই ত্যাগ স্বীকার করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

