বাংলাদেশ পুলিশে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান বা প্রশাসনিক রদবদলের অংশ হিসেবে ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী ‘জনস্বার্থে’ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক শীর্ষ কর্মকর্তার বিদায় নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরসহ প্রশাসনের অন্দরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছেন পুলিশ স্টাফ কলেজের ডিআইজি ড. এ এফ এম মাসুম রব্বানী, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং রংপুর পিটিসি-র পলাতক কমান্ড্যান্ট (ডিআইজি) মহা. আশরাফুজ্জামান। এছাড়াও এন্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি এ জেড এম নাফিউল ইসলাম ও মো. মনিরুল ইসলাম এবং নৌ পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আবুল ফয়েজকেও অবসরে পাঠানো হয়েছে।
তালিকায় আরও নাম রয়েছে পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মাহফুজুর রহমান ও শামীমা বেগম, এপিবিএন সদর দপ্তরের ডিআইজি মো. মুনিবুর রহমান এবং রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনের। শিল্পাঞ্চল পুলিশের ডিআইজি আবু কালাম সিদ্দিক, টেলিকমের ডিআইজি মো. আমিনুল ইসলাম এবং এপিবিএন-এর (পার্বত্য জেলা) ডিআইজি সালমা বেগমকেও একই প্রক্রিয়ায় অবসরের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও এই কর্মকর্তারা বিধি মোতাবেক অবসরজনিত সকল আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন। তবে ঠিক কী কারণে বা কোন বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এতজন বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের কর্মকর্তাকে একসাথে অবসরে পাঠানো হলো, সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
সাধারণত সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সরকার চাইলে যেকোনো কর্মকর্তাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই জনস্বার্থে অবসরে পাঠাতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড সংস্কার এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এটি তারই অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একপক্ষ মনে করছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এমন কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে, কোনো কোনো মহলে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই আদেশের ফলে শূন্য হওয়া পদগুলোতে দ্রুত নতুন নিয়োগ বা পদোন্নতি দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রশাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং কর্মস্পৃহা বাড়াতে এ ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়মিত কাজেরই অংশ। তবে ১৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার একসাথে বিদায় নেওয়ার ঘটনাটি বর্তমান সরকারের মেয়াদে অন্যতম বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই রদবদলের পর পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।

