বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এবার আসতে চলেছে এক আমূল পরিবর্তন। বই-খাতার পাশাপাশি খুদে শিক্ষার্থীদের হাতে উঠবে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটজাত ব্যাগ আর পরনে থাকবে একই ধাঁচের স্কুল ড্রেস। সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল শিক্ষা উপকরণের জোগান নয়, বরং শিশুদের মনে পরিবেশ সচেতনতা ও সাম্যের বীজ বুনে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন বুধবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এই যুগান্তকারী প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সকাল থেকেই সচিবালয়ে ছিল সাজ সাজ রব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মাহদী আমিন জানান, দেশীয় পণ্যকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগান ছড়িয়ে দিতে এই বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই মাস থেকেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে সারাদেশের প্রতিটি উপজেলায় দুটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রকল্পের শুরুর ধাপ নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, “জুলাই মাসে আমরা প্রথম পর্যায়ে প্রথম শ্রেণির প্রায় ১ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছে এই বিশেষ ব্যাগ ও পোশাক পৌঁছে দেব। এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একসাথে কাজ করছে।” পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এই সুবিধার আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এই উদ্যোগের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক কারণ নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক দর্শন কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার যে দৃশ্যমান ব্যবধান, তা ঘোচানোর শুরুটা হতে হবে স্কুল থেকেই। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি শিশুর মধ্যে ন্যায্যতা ও সমতা থাকবে। যখন ক্লাসের প্রতিটি শিশুর পিঠে একই ধরনের দেশি ব্যাগ থাকবে এবং পরনে থাকবে একই পোশাক, তখন তাদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্যের মানসিকতা তৈরি হবে না।”
পরিবেশের সুরক্ষায় পাটের ব্যবহার ফেরানো এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সরকার চায় আধুনিক প্রজন্ম যেন পলিথিন বা প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে সোনালী আঁশের ঐতিহ্যে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। মাহদী আমিন মনে করেন, শিশুদের মাধ্যমে পরিবারগুলোতে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তিনি বলেন, “পাটের ব্যাগ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা শিশুদের পরিবেশের পাঠ দিচ্ছি। আমাদের হারানো ঐতিহ্য ও গৌরবকে ফিরিয়ে আনার এটি একটি শক্তিশালী সংকেত।”
তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রান্তিক এলাকার প্রতিটি শিশু যেন এই সুবিধার সমান অংশীদার হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী ভিশন হলো, বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য যেন এদেশের মানুষের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে। স্কুল ড্রেস এবং ব্যাগের এই বিশাল চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে দেশের পাটকল ও বস্ত্রশিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া এই প্রকল্পে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে যাতে একদম শুরু থেকেই তারা একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে উঠতে পারে। সচিবালয়ের করিডোরে এই ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা ইতিবাচক আলোচনা। অভিভাবকরা মনে করছেন, এতে যেমন তাদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে, তেমনি সন্তানদের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বকীয়তা জাগ্রত হবে।
বিকেলে ব্রিফিং শেষ করে ফেরার পথে মাহদী আমিন আবারও মনে করিয়ে দেন, এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং এটি আগামীর ‘ন্যায্য’ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। খুদে শিক্ষার্থীদের এই নতুন পথচলা দেশের সোনালী আঁশের হারানো দিনগুলো ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন জুলাইয়ের অপেক্ষায় লাখো শিক্ষার্থী আর তাদের পরিবার।

