দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)-এর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তার সরকার মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর এবং সাংবাদিকতার পথে কোনো বাধা সহ্য করা হবে না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকরা অংশ নেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর নোয়াব সদস্যদের সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। বৈঠকে সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান সংকট, কাগজের শুল্ক এবং বিজ্ঞাপন নীতিমালাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন সংবাদপত্র মালিকরা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় নিয়ে সংবাদপত্র মালিকদের প্রতিটি সমস্যার কথা শুনেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, “সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি আমাদের অবস্থান স্বচ্ছ। আমরা বিশ্বাস করি, গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।”
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তার দৈনন্দিন অভ্যাসের কথা উল্লেখ করে জানান, তিনি নিয়মিত পত্রিকা পড়েন এবং টেলিভিশনের সংবাদ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন ভোরে পত্রিকা পড়ি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত জনদুর্ভোগ বা দুর্নীতির খবরকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দেই এবং সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিই।” এটি কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং দেশের নাড়ির স্পন্দন বোঝার মাধ্যম বলে তিনি অভিহিত করেন।
নোয়াবের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি এএসএম শহীদুল্লাহ খান, কোষাধ্যক্ষ আলতামাশ কবির এবং সদস্য এ কে আজাদ। এ ছাড়া সম্পাদকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন এবং বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। করতোয়া সম্পাদক মোজাজ্জেল হক, পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. রমীজউদ্দিন চৌধুরী এবং ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর প্রকাশক নাসিম মনজুরও আলোচনায় অংশ নেন।
সম্পাদকরা বর্তমান সময়ে সংবাদপত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আর্থিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ডিজিটাল মিডিয়ার ভিড়ে ছাপা কাগজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল পরিশোধের বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদপত্র শিল্পকে আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যমের এই আন্তরিক বৈঠক আগামী দিনের স্থিতিশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। বিশেষ করে নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সংবাদপত্র পাঠ এবং খবরের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে। বৈঠক শেষে নোয়াব নেতারাও সরকারের এই উদার ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
সচিবালয়ের এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এও মনে করিয়ে দেন যে, স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের একটি বড় দায়িত্ব হলো সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। তিনি গুজব ও অপপ্রচার রোধে মূলধারার গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

