আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা ‘কোটি টাকার ঘুষ’ দাবির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। জামিন করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের পরিবারের কাছ থেকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দাবি করার অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর থেকেই বিচার বিভাগে তোলপাড় চলছিল। মঙ্গলবার রাতে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম তদন্তের এই অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের জানান, অভিযোগটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় একটি বিশেষ ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডের সত্যতা পাওয়া গেছে। আমিনুল ইসলাম বলেন, “ফাঁস হওয়া কথোপকথনে সাইমুম রেজার কণ্ঠস্বর শনাক্ত করা গেছে। তবে কেবল টাকা দাবিই নয়, পর্দার আড়ালে কোনো আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।”
এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমসহ ছয়জন নিহতের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফজলে করিম বর্তমানে কারান্তরীণ। গত ৯ মার্চ প্রসিকিউটর সাইমুম রেজার দুটি ফোনালাপ জনসমক্ষে আসে। সেখানে ফজলে করিমের আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফের কাছে জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করতে শোনা যায় তাকে।
আলোচিত ওই অডিও ফাঁসের পরপরই ৯ মার্চ পদত্যাগ করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। যদিও ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগের পথ বেছে নেন। তবে পদত্যাগ করলেই পার পাওয়া যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ। চিফ প্রসিকিউটর সাফ জানিয়েছেন, পদত্যাগ সত্ত্বেও তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে।
চট্টগ্রামের এই প্রভাবশালী সাবেক এমপির বিরুদ্ধে গত ৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। এরপর ৭ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগটি আমলে নেন। ঠিক এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে প্রসিকিউশন টিমের সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খুব দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। সেখানে কেবল সাইমুম রেজা নন, বরং আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এমন দুর্নীতি বা নৈতিক স্খলন বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে সাইমুম রেজার পদত্যাগের পর ট্রাইব্যুনাল তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই বিশেষ আদালত যাতে কোনো প্রকার বিতর্ক বা অশুভ প্রভাবের শিকার না হয়, সে বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। দ্রুতই এই তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গণসমক্ষে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

