রাজধানীর বুকে মাত্র ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে একজন চিকিৎসকের জীবন বিপন্ন করার এক হাড়হিম করা ছক ফাঁস করেছে র্যাব। মহাখালী জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক ড. আহমদ হোসেনের ওপর বর্বরোচিত হামলার নেপথ্যে ছিল হাসপাতালের টেন্ডার বা ঠিকাদারি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধ। মঙ্গলবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান বাহিনীর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
ঘটনার সূত্রপাত গত কয়েকদিন আগে, যখন একদল সন্ত্রাসী দিনের আলোতে ড. আহমদ হোসেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার পিঠ ও হাত ক্ষতবিক্ষত হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিজ কর্মস্থল ক্যান্সার হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এই ঘটনায় বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মামলাটির ছায়া তদন্তে নেমে র্যাব উদ্ঘাটন করেছে পেশাদার অপরাধী ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের এক ভয়ংকর আঁতাত।
র্যাব জানায়, ঘটনার পর থেকেই গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। র্যাব-১ এবং সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার যৌথ অভিযানে রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে শরিফুল আলম করিম, বাড্ডা থেকে আমিনুল ইসলাম কালু, সাজ্জাদ বদি, সালাউদ্দিন এবং গুলশান এলাকা থেকে আরিফুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছে যে, মাত্র ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে তারা এই হামলায় অংশ নিয়েছিল। টেন্ডার কমিটিতে থাকা চিকিৎসকের ওপর হামলা চালিয়ে মূলত ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ঠিকাদারি কাজে আধিপত্য বিস্তার করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, হাসপাতালের সাপ্লাই ও সংস্কার কাজের টেন্ডার নিয়ে ‘রুবেলের ইএমই ট্রেডার্স’ এবং ‘মোনায়েম গ্রুপ’—এই দুটি পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিল। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে রুবেল নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি শরিফুল আলম করিমের মাধ্যমে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ড. আহমদ হোসেনকে ‘শিক্ষা দেওয়ার’ নির্দেশ দেন। রুবেল বিদেশে থাকলেও তার নির্দেশে দেশে থাকা সহযোগীরা নিখুঁতভাবে এই হামলার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে।
র্যাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই হামলার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এটি নিছক একটি ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও টেন্ডার দখলের পেশিশক্তির লড়াই। উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “হামলার ধরন দেখে মনে হয়েছে তারা ভিকটিমকে হত্যা করতে চায়নি, বরং গুরুতর আঘাতের মাধ্যমে তাকে পঙ্গু করে দেওয়া বা মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যাতে ভবিষ্যতে টেন্ডার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি বাধা হতে না পারেন।”
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শরিফুল আলম করিম হামলার মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। রুবেল মালয়েশিয়া থেকে টাকা পাঠালে সেটি এই ভাড়াটে খুনিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। মাত্র চার অংকের টাকার বিনিময়ে একজন উচ্চপদস্থ চিকিৎসকের ওপর এমন হামলা আধুনিক সমাজব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ড. আহমদ হোসেন বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকলেও তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন সহকর্মীরা।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তারা আরও জানান, বিদেশে পলাতক মূল পরিকল্পনাকারী রুবেলকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বা আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগী চিকিৎসকের দেওয়া জবানবন্দি এবং গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তি মিলিয়ে একটি শক্তিশালী চার্জশিট তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডার সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্য বন্ধে রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
এই ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এলো সরকারি হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারী অশুভ চক্রের ক্ষমতা। একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের নিরাপত্তা যখন বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বিঘ্নিত হয়, তখন তা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলার ওপর এক বড় আঘাত। রাজধানীবাসী ও চিকিৎসক সমাজ এখন এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন হীন কর্মের সাহস না পায়।

