২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নজিরবিহীন ইন্টারনেট শাটডাউন এবং উসকানিমূলক বার্তার মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগে করা মামলায় আজ গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে যাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেবেন বিটিসিএল-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
রোববার (১৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত ও স্বচ্ছতার স্বার্থে বিটিসিএল কর্মকর্তার এই জবানবন্দি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আদালতের আজকের কার্যসূচির শুরুতেই থাকছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন করার পর্ব। তিনি এই মামলার চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে আগেই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আজ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন। এরপরই রাষ্ট্রপক্ষের পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে বিটিসিএল কর্মকর্তার জবানবন্দি দেওয়ার কথা রয়েছে।
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রসিকিউশন এই কর্মকর্তার নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ইন্টারনেট বন্ধের নেপথ্যে কারা ছিল এবং কার নির্দেশে ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবেন।
মামলার দুই প্রধান আসামির মধ্যে জুনাইদ আহমেদ পলক বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক থাকায় তার পক্ষে মামলার লড়ছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম। আজকের শুনানিতে পলককে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই দুই হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির বিরুদ্ধে মূলত তিনটি প্রধান অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে পলক ফেসবুকে উসকানিমূলক বার্তা ছড়িয়েছিলেন। এর সরাসরি প্রভাবে পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই সময়ে সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তথ্য প্রবাহ রোধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে জয় ও পলকের সরাসরি প্ররোচনা ছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে। এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের হামলায় রাসেল ও মোসলেহ উদ্দিনসহ অন্তত ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে।
তৃতীয় অভিযোগে উত্তরার ঘটনায় ৩৪ জনকে হত্যায় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রসিকিউশনের দাবি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গণহত্যায় সহায়তা করার প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন এই মামলার ফরমাল চার্জ জমা দিয়েছিল। আদালত তা আমলে নেওয়ার পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জয় ও পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মাধ্যমেই শুরু হয় জুলাই গণহত্যার দায়ে ডিজিটাল অপরাধের প্রথম কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে প্রচার করা হলেও পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। আজকের সাক্ষ্যগ্রহণ সেই নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনজীবীরা বলছেন, বিটিআরসি এবং বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যই নির্ধারণ করে দেবে যে, ইন্টারনেট বন্ধ করাটা কি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল নাকি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যদি এটি একটি পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আসামিদের দায় এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আদালত প্রাঙ্গণে আজ সকাল থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন ট্রাইব্যুনালের দিকে। বিশেষ করে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তারা বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ন্যায়বিচারের আশায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ অত্যন্ত সংবেদনশীল।
প্রসিকিউশন টিম আত্মবিশ্বাসী যে, পর্যায়ক্রমে আসা এই সাক্ষীরা অপরাধের একটি স্বচ্ছ রূপরেখা আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারবেন। বিটিসিএল কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর মামলার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের বিচার প্রক্রিয়ায় আজকের দিনটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। সজীব ওয়াজেদ জয় এবং জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণের পথে রাষ্ট্রপক্ষ আজ এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই বিচার কার্যক্রম নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও গভীর আগ্রহ রয়েছে। ডিজিটাল অপরাধ এবং এর মাধ্যমে সংঘটিত শারীরিক সহিংসতার এই বিচার দক্ষিণ এশিয়ার বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

