পহেলা বৈশাখের উৎসবে যখন গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখন রাজধানীর রাজপথে ভিন্ন এক চিত্র। উৎসবের আনন্দ ম্লান করে দিয়ে তেলের পাম্পগুলোতে দেখা গেছে মানুষের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রতীক্ষা। মঙ্গলবার ছুটির দিনেও রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে। একেকজন চালককে মাত্র কয়েক লিটার তেল পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা।
সকাল থেকেই তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্প এবং মাতুয়াইলের মেসার্স খান অ্যান্ড চৌধুরী ফিলিং স্টেশনে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মীদের। সরেজমিনে দেখা যায়, তেজগাঁওয়ের লাইন মহাখালী ছাড়িয়ে গেছে, আর ব্যক্তিগত গাড়ির সারি পৌঁছেছে নাখালপাড়া পর্যন্ত। উৎসবের দিনে অনেক পাম্প বন্ধ থাকায় খোলা থাকা স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালক প্রান্ত কুমার তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকাল থেকে লাইনে আছি, ৫ ঘণ্টা হয়ে গেল। লাইন মহাখালী পর্যন্ত চলে গেছে। আজ ছুটির দিনে অনেক পাম্প বন্ধ, তাই ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।” একই অবস্থা আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনেও। সেখানে সুজন নামের এক চালক জানান, তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরও তেল পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেখছেন না তিনি।
জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকটের মূলে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের বাজারে জ্বালানির চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এর ওপর সাধারণ মানুষের মাঝে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ৬ মার্চ থেকেই সরকার জ্বালানি তেলে রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।
বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে গত ১২ এপ্রিল (রবিবার) থেকে ঢাকার ৭টি স্টেশনে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাশ’ অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এই অ্যাপ ব্যবহারকারীরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার তেল নিতে পারছেন, আর সাধারণ চালকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫০০ টাকার তেল। তেজগাঁও, মহাখালী, আসাদগেট ও শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এই ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর হলেও দীর্ঘ লাইন এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
পাম্প মালিকদের মতে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। উৎসবের কারণে অনেক পাম্পের শ্রমিকরা ছুটিতে থাকায় এবং ডিপো থেকে তেল আসার গতি ধীর হওয়ায় এই সংকট প্রকট হয়েছে। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্পের স্টক শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদের খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রেশনিং বা অ্যাপ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা না কমা পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্যানিক বায়িং বন্ধ করতে পারলে এবং তেলের অবৈধ মজুত ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হতে পারে।
আজকের উৎসবের দিনে যখন মানুষের ঘরে ফেরার কথা, তখন হাজার হাজার মানুষ রোদের মধ্যে পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে পার করছেন বছরের প্রথম দিনটি। বৈশাখের এই আনন্দ যেন জ্বালানি সংকটের ধূসর ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া—যেকোনো উপায়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হোক এবং রাজপথের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটুক।

