রাজধানীর রাজপথে রঙের জোয়ার আর বাদ্যের তালে নতুন বছর ১৪৩৩-কে বরণ করে নিতে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রাটি উৎসবমুখর পরিবেশে সমাপ্ত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয় এই বিশাল পদযাত্রা। প্রতিবছরের মতো এবারও এই আয়োজন কেবল উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল সমসাময়িক বিশ্ব ও দেশীয় সংকটের এক সাহসী দর্পণ।
সকাল থেকেই টিএসসি ও চারুকলা এলাকা ছিল জনারণ্য। ঢোল, খোল আর বাঁশির সুরের সঙ্গে রঙিন মুখোশ, শখের হাড়ি আর নানা লোকজ মোটিফ হাতে মিছিলে যোগ দেন সব বয়সী মানুষ। তবে এবারের উৎসবের আমেজে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবিক সংকটের বার্তা। বিশেষ করে অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ সম্বলিত প্ল্যাকার্ডগুলো সবার নজর কেড়েছে।
শোভাযাত্রার ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, কেবল চিরায়ত লোকজ ঐতিহ্য নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অবিচার আর শোষণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার দাবির পাশাপাশি ‘ইরানে মার্কিন যুদ্ধ বন্ধ করো’ এবং ‘গণহত্যাকারীদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করো’—এমন সব স্লোগান বহনকারী প্ল্যাকার্ডগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, বাঙালির নববর্ষ কেবল নিজের আনন্দের দিন নয়, বরং বিশ্বের সব নিগৃহীত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশেরও দিন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিও উঠে এসেছে এই রাজপথে। ‘বাঁচাও সুন্দরবন’, ‘ফসলের লাভজনক মূল্য দাও’ এবং ‘শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করো’—এরকম বিভিন্ন দাবির প্ল্যাকার্ড হাতে অনেককেই মিছিলে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এই প্রতীকী প্রতিবাদের ভাষা যেন মঙ্গল শোভাযাত্রার আদি উদ্দেশ্যকে আরও সার্থক করে তুলেছে—যা মন্দের বিনাশ আর নতুনের আবাহনকে ধারণ করে।
এদিকে চারুকলা অনুষদ কেন্দ্রিক নববর্ষের সাংস্কৃতিক আয়োজনেও কোনো ভাটা পড়েনি। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পুরো এলাকা সাজানো হয়েছে নতুন সাজে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন বিকেল থেকেই বকুলতলায় চলে লোকসংগীত ও নৃত্যের বর্ণাঢ্য পরিবেশনা। গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে শিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে মাটির গান, যা আগত দর্শকদের মুগ্ধ করে।
উৎসবের এই রেশ এখানেই শেষ হচ্ছে না। আগামী ১৫ ও ১৬ এপ্রিল চারুকলা চত্বরে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’। শেকড়ের সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে আয়োজকরা জানান। নাগরিক যান্ত্রিকতার মাঝে বিলুপ্তপ্রায় যাত্রাশিল্পের এই উপস্থাপনা দর্শকদের বাড়তি আনন্দ জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে এবারের শোভাযাত্রা শেষ হলেও, মানুষের মনে রয়ে গেছে একরাশ প্রত্যাশা। চারুকলার সামনের রাজপথে পড়ে থাকা আবির আর বাদ্যের রেশ যেন বলে যাচ্ছে—বাঙালির এই উৎসব আজ বিশ্ব মানবতার এক অভিন্ন মঞ্চ। যেখানে সুর আর রঙের আড়ালে লুকানো থাকে অন্যায়ের প্রতিবাদ আর এক উন্নত আগামীর স্বপ্ন।

