ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন রমনার অশ্বত্থ গাছের ডালপালা ভেদ করে ঘাসের ওপর আলপনা আঁকছিল, ঠিক তখনই বাঁশির সুরে জানান দিল এক নতুন বছরের আগমন। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর রমনা বটমূলে শুরু হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব—পহেলা বৈশাখ। আজ ১৪ এপ্রিল, ২০২৬। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুন সূর্যের আলোয় অবগাহন করতে আবারও মিলিত হয়েছেন হাজারো মানুষ।
সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে যখন গোটা শহর আড়মোড়া ভাঙছে, তখন ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘জাগো আলোক-লগনে’। এই আহ্বানের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ এবং ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে’। সুরের মায়াজালে আবদ্ধ হলো পুরো রমনা উদ্যান।
এবারের অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা কবিগুরুর অমোঘ বাণী—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের মন থেকে ভয় দূর করে আত্মমর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক দৃপ্ত অঙ্গীকার ফুটে উঠেছে এই থিমে। ছায়ানটের এই আয়োজন কেবল গান বা আবৃত্তির অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার এক বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক লড়াই।
এবারের বর্ণিল আয়োজনে পরিবেশিত হচ্ছে মোট ২২টি গান। এর মধ্যে ৮টি সম্মেলক গান এবং ১৪টি একক কণ্ঠের পরিবেশনা রয়েছে। গানের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পাঠের স্নিগ্ধতা যেন উৎসবের আমেজকে আরও গভীর করে তুলেছে। ছায়ানটের শিশু বিভাগ থেকে শুরু করে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিশিষ্ট শিল্পীরা মিলে প্রায় ২০০ জন শিল্পী এবারের মঞ্চে একযোগে অংশ নিয়েছেন।
রমনা বটমূলের এই আয়োজনটি কেবল বর্তমানের নয়, এটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। ১৯৬৭ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) ছায়ানট এই স্থানে নববর্ষের প্রথম প্রভাতে সংগীতের ডালি সাজিয়ে বসেছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা প্রতিবন্ধকতা এলেও বাঙালি সত্তার এই পরিচয় কোনো অপশক্তি মুছে দিতে পারেনি। ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি আর শুদ্ধ চেতনার জয়গানই এই বটমূলের প্রধান সুর।
অনুষ্ঠানের গানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে অত্যন্ত যত্নের সাথে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য এবং অতুল প্রসাদের সুর এখানে নতুন প্রাণ পেয়েছে। শুধু উচ্চাঙ্গ বা আধুনিক গান নয়, লালন সাঁইয়ের মরমী গান থেকে শুরু করে লোকজ সুরের মূর্ছনা দর্শক-শ্রোতাদের শিকড়ের সন্ধানে নিয়ে যায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সাথে শহুরে নাগরিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা গেছে আজ।
সকাল গড়ানোর সাথে সাথে জনসমুদ্র আছড়ে পড়তে শুরু করে রমনার চারপাশে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার পরনে বৈশাখী সাজ—লাল-সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবি। শিশুদের কপালে আঁকা আলপনা আর হাতে ছোট একতারা; এক খণ্ড বাংলাদেশ যেন উঠে এসেছে রমনার সবুজ চত্বরে। কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো বিভাজন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকলেও মানুষের উচ্ছ্বাসে কোনো কমতি নেই। উৎসবপ্রিয় এই জাতি প্রতি বছরই প্রমাণ করে দেয়, সংস্কৃতির টান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। রমনার বটমূলের এই সংগীতায়োজন কেবল গান শোনা নয়, এটি বাঙালির মিলনমেলা। এখানে একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে তৈরি হয় এক পরম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক জানান, তারা প্রতি বছরই চেষ্টা করেন বাঙালির আত্মপরিচয়কে গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিতে। এবারের ‘ভয়শূন্য’ থাকার আহ্বান কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি আগামীর বাংলাদেশের পথচলার পাথেয়। প্রতিকূলতা আসবে, কিন্তু সংস্কৃতি মানুষকে লড়তে শেখায়—এই বিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে আজকের সুরলহরীতে।
উদ্বোধনী পর্ব শেষ হওয়ার পরও মানুষের স্রোত কমেনি। রমনা থেকে টিএসসি, শাহবাগ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—সবখানেই রঙিন ভিড়। মেলায় মাটির পুতুল, হাতপাখা আর শখের হাঁড়ির যে সমারোহ, তা জানান দেয় আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে একদিনের জন্য হলেও সবাই যেন ফিরে গেছে বাংলার শাশ্বত লোকজ স্বভাবে।
এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বছরের প্রতিটি দিন যেন এমন আনন্দঘন এবং সম্প্রীতিময় হয়। পহেলা বৈশাখের এই প্রভাতি অনুষ্ঠান শেষ হবে আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে। যেন আগামীর দিনগুলো শান্তিময় হয় এবং হিংসা-বিদ্বেষের ছায়া থেকে মুক্ত থাকে বাংলাদেশ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই নব প্রভাত বয়ে আনুক কল্যাণ আর সমৃদ্ধি—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

