রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত মানবিক চিকিৎসার অনন্য প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতাল এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত আতঙ্কের জনপদ। বিনাপারিশ্রমিকে হাজারো কিডনি প্রতিস্থাপন করে খ্যাতিমান হওয়া অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের এই প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, মালামাল সরবরাহে চাপ প্রয়োগ এবং কৃত্রিমভাবে ‘মব’ বা জনরোষ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন শেরেবাংলা নগর থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মঈন উদ্দিন মঈন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নিজের উদ্বেগ ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় থেকেই মঈন উদ্দিন হাসপাতালের সাপ্লাই চেইন বা মালামাল সরবরাহ ব্যবস্থা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছেন এবং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পণ্য নিতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে ডা. কামরুল বলেন, তার অগোচরেই বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে হাসপাতালে চাল, ডিমসহ নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হচ্ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, যে চালের বাজারমূল্য ৬৬ টাকা, মঈন সেটির বিল ধরছিলেন ৭৭ টাকা। একইভাবে এক হাজার ডিমের বাজারমূল্য ৮ হাজার ১০০ টাকা হলেও মঈন ৯ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করতেন। এই অনিয়ম ধরা পড়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি বাজার থেকে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিলে মঈন চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরবরাহ কাজ থেকে বাদ পড়ার পর মঈন উদ্দিন গত ১০ এপ্রিল শুক্রবার সকালে দলবল নিয়ে হাসপাতালে হাজির হন। সেখানে তিনি কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে এক ভীতিকর পরিবেশ বা ‘মব’ তৈরির চেষ্টা করেন। এর আগেও গত ২৯ মার্চ তিনি হাসপাতালের কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় ৩০ মার্চ শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি নং-২২৬৬) করা হয়েছে।
ডা. কামরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা রোগীদের খাবারের কোনো বিল ধরি না, স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেই। কিন্তু এই ধরনের চাঁদাবাজি ও অপপ্রচার চললে সেবা কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, মঈন উদ্দিন তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হাসপাতালের সামনে জনসমাগম তৈরির মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা করছেন।
তবে ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে শুক্রবার গভীর রাতেই যুবদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব—সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন হাসপাতালে গিয়ে ডা. কামরুল ইসলামের সাথে দেখা করেন। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মঈন উদ্দিনের এই অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না এবং তাকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যুবদল নেতারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, চাঁদাবাজির বিষয়ে দল ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. কামরুল ইসলাম দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, প্রশাসন এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “পুলিশ এবং র্যাবের সহায়তায় আমরা একটি নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ ফিরে পেতে চাই।”
বিগত ১৭ বছরে এই হাসপাতালটি দুই হাজারেরও বেশি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করেছে। এমন একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির চেষ্টা সাধারণ মানুষের মনেও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এখন দেখার বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনকে কত দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পারে।

