বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা এখন স্থায়ী রূপ পেল। বুধবার জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে দলটির মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও প্রচারণার পথ আনুষ্ঠানিকভাবে রুদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আগের সেই বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যাদেশটি এখন একটি শক্তিশালী সংসদীয় আইনের ভিত্তি লাভ করল।
নতুন পাস হওয়া এই আইনের ৩ ধারাটি অত্যন্ত কঠোর। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠন বা সত্তার পক্ষে কোনো ধরনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যাবে না। শুধু তা-ই নয়, মুদ্রণ মাধ্যম, অনলাইন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দলটির কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। জনসম্মুখে বক্তৃতা, সংবাদ সম্মেলন কিংবা যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগের নাম বা পরিচয় ব্যবহারের ওপর জারি করা হয়েছে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।
সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের আগে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিলটি পর্যালোচনার জন্য বাড়তি সময়ের আবেদন করেছিলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, বিলের কপি হাতে পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত পাস করা সংসদীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেই দাবি নাকচ করে দেন। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব জমা না পড়ায় বিলটি নিয়ে আর আলোচনার সুযোগ নেই।
বিলের যৌক্তিকতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ অধিবেশনে এক আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, “এই সংশোধনীটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য আনা হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন যে, বিরোধী দল এবং এনসিপির আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট প্রবল জনমতের প্রতিফলনই হলো এই নতুন আইন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এই আইনের কারণেই নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের রেজিস্ট্রেশন বর্তমানে স্থগিত রাখা সম্ভব হয়েছে।
আওয়ামী লীগের এই পতনের পথ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সেই বছরের ২৩ অক্টোবর প্রথমে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১১ মে একটি বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। আজ সংসদে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে সেই স্থগিতাদেশই স্থায়ী আইনি কাঠামোতে রূপ নিল, যা দলটির পুনরুত্থানের সব পথ কার্যত বন্ধ করে দিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইনের ফলে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা বা পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একটি দলকে এভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিরল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার প্রাথমিক ধাপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদীয় অনুমোদনের পর এখন প্রশ্ন উঠছে, মাঠপর্যায়ে এই আইনের প্রয়োগ কতটা কঠোর হবে? বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলটির সমর্থকদের তৎপরতা বন্ধ করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে আপাতত আইনি দলিলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাংলাদেশে এখন ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবেই গণ্য হবে।

