দেশের প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে অনলাইন ও অফলাইন—এই দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি ‘ব্লেন্ডেড’ বা মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর গুরুত্ব নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের এই নতুন ভাবনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নমনীয় করার বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যেই নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে, যা খুব শীঘ্রই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রোজা, পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়া আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।” এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
তবে কেবল ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয় বলে মনে করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রযুক্তির সহায়তায় কিছু ক্লাস ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। সরকারের হাতে থাকা একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আংশিক অনলাইন শিক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন।
ব্লেন্ডেড পদ্ধতির সুবিধা থাকলেও এর কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে সরকার সতর্ক। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনলাইন শিক্ষা তাদের সামাজিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, শিক্ষার্থীরা যাতে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই অফলাইন ও অনলাইনের ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।
বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভা বৈঠককে এই প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং মন্ত্রিসভায় বিস্তারিত আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই পদ্ধতিটি স্কুল পর্যায়ে চালুর পরিকল্পনা থাকলেও কলেজ পর্যায়কেও এর আওতায় আনা হতে পারে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষায়িত পাঠদান পদ্ধতির কারণে সেখানে আপাতত ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মন্ত্রী। তবে সামগ্রিক লক্ষ্য হলো শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার ঠিক রাখা এবং সেশন জট এড়ানো।
মন্ত্রণালয় কেবল পাঠদান পদ্ধতি নিয়েই ভাবছে না, বরং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে মহানগরীগুলোতে তীব্র যানজট ও জ্বালানি সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে বৈদ্যুতিক বাস, মেট্রো রেলের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সৌরশক্তিচালিত পরিবহনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি টেকসই শিক্ষা কাঠামো তৈরি করাই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই রূপরেখা কতটা পূর্ণতা পায়।

