বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যাচ্ছেন সরকারের কোনো শীর্ষ প্রতিনিধি। আগামী ৭ এপ্রিল দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নির্ধারণে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মূলত মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ‘ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স’ বা ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। তিনি ঢাকা থেকে সরাসরি মরিশাস না গিয়ে দিল্লি হয়ে সেখানে পৌঁছাবেন। এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির মাঝেই ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সূচি নির্ধারিত হয়েছে।
সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সফরসঙ্গী হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন প্রশাসনের এই প্রথম দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার শীতলতা কাটিয়ে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে এই সফর বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নয়াদিল্লি সফরের প্রথম দিনেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন ড. খলিলুর রহমান। এই বৈঠকে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মধ্যকার চলমান বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এছাড়া ভারত সরকারের আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রতিনিধির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতের বিষয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় করছে।
সূত্রমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও একটি বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের অবস্থান সেখানে স্পষ্ট করা হতে পারে। পাশাপাশি ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গেও জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার তোড়জোড় চলছে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। মরিশাসে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে দিল্লির সঙ্গে এই আলোচনা মূলত আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের প্রভাব বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে ভারতের সঙ্গে পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোর এটিই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক সুযোগ। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি স্বচ্ছ ধারণা এই সফরের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। দিল্লিও বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা এই সফরের প্রস্তুতির দ্রুততা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
৭ এপ্রিলের এই সফর কেবল একটি রুটিন ভিজিট নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার বন্ধুত্বের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর হতে পারে। দুই দিনের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঠাসা কর্মসূচির সফর শেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিশাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। সফর শেষে ফিরে এসে তিনি ভারতের সঙ্গে হওয়া আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

