মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান ভয়াবহ গৃহযুদ্ধই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই সংকটের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রক্রিয়াটি থমকে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক চাপ ও আইনি লড়াই সমানতালে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বিস্তারিত তথ্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে নেপিদো। যাচাইকৃতদের মধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মিয়ানমার তাদের ‘সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে। বাকিদের নাগরিকত্ব ও অবস্থানের বিষয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রায় ২ লাখ এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে আরও ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে সফলভাবে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার আন্তর্জাতিক মহলকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সংকট সমাধানে সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পর্কে ড. খলিলুর রহমান জানান, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ ইভেন্ট আয়োজন করা হয়। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া গত বছরের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অংশীজনদের নিয়ে সংলাপের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতিও বিশ্ববাসীর নজরে আনা হয়েছে।
কেবল কূটনীতি নয়, আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াইকেও সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) চলমান ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাটি বাংলাদেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গত ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আইনি লড়াইকে বেগবান করতে গাম্বিয়াকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
রাখাইনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় সীমান্তেও এর প্রভাব পড়ছে। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে এবং ওআইসির আসন্ন বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন রেজুলুশন গৃহীত হবে, যা মিয়ানমারের ওপর চাপ আরও বাড়াবে।
সংসদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে—রোহিঙ্গাদের কেবল ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজ ভূমিতে পুনর্বাসন করাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেছে ঢাকা।
পুরো বিষয়টি এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক সংকটের জট কতটা দ্রুত খুলবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে সরকারের কঠোর অবস্থান ও আন্তর্জাতিক লবিং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটিকে বিশ্বমঞ্চে জীবন্ত করে রেখেছে।

