দেশের নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) আর ১৯৭২ সালের পুরনো সংবিধানের কাঠামোতে ফিরে যেতে চায় না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন জাতীয় সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনাকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। হাতিয়া থেকে নির্বাচিত এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এই তরুণ আইনপ্রণেতা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তরুণদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দাবি জানান।
নিজের বক্তব্যে হান্নান মাসউদ বলেন, “আমি এই সংসদের এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এমপি। আমি সেই জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে কথা বলছি, যারা পরিবর্তন চায়। স্বাধীনতার ৩০ বছর পরে জন্ম নিয়েও আমার মতো তরুণরা কেন দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, আজ সেই জবাব দেওয়ার সময় এসেছে।”
একাত্তরের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার সংঘাত
তিনি তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে একাত্তরের বীর শহীদদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা রক্ত দিয়েছিলেন একটি নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য। তাঁরা চেয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্ম যেন ভোটাধিকার পায়, যেন দেশে আর কোনো রক্ষীবাহিনী বা দুর্ভিক্ষ না হয়। কিন্তু আমরা কী দেখেছি? আমরা দেখেছি ১৯৭৩ সালে ভোট চুরি হয়েছে, পরবর্তীকালে দেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে।”
হান্নান মাসউদ তাঁর বক্তব্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিকভাবে পুনরুদ্ধারের পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি এবং বেগম জিয়া বারবার আমার অবহেলিত জনপদ হাতিয়ায় গিয়েছেন। কিন্তু আজও সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভূমিহীন ও গৃহহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।”
নির্বাচনী সহিংসতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা
নিজের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা তুলে ধরে এই তরুণ এমপি বলেন, “আমি এই নির্বাচনে নগ্ন ভোট ডাকাতি দেখেছি। সবচেয়ে কম বয়সী প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাতে গিয়ে আমি তিন-তিনবার হামলার শিকার হয়েছি। এমনকি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও এলাকায় গেলে আমাকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কোপাতে আসা হয়েছে, যার ভিডিও প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের হাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের রক্ত লেগে আছে, তারাই আজ নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা রাষ্ট্র আর সইবে না। বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য এ দেশে আবারও দিতে হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার অভিযোগ
এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন হান্নান মাসউদ। তিনি অভিযোগ করেন, “আমার এলাকায় কেবল ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে একজন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, সন্ত্রাসীরা এখনও বুক ফুলিয়ে ঘুরছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্য মন্ত্রীদের হয়ে কথা বলতে ব্যস্ত না থেকে দেশের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি সেখানে ব্যর্থ হচ্ছেন।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জেন-জি প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন এবং নতুন সাংবিধানিক কাঠামো চায়, যা তাদের প্রকৃত ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। পুরাতন ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে তরুণদের আর থামিয়ে রাখা যাবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।

