জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই সংসদে তাঁদের আসার মূল উদ্দেশ্য প্রচলিত কোনো ‘সংবিধান সংশোধন’ নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বা ‘সংবিধান সংস্কার’ করা। রোববার (২৯ মার্চ) রাতে সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই ঐতিহাসিক অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদ পরিচালনায় ফ্লোর দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য কাম্য নয়। বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হলে সংসদের প্রকৃত সৌন্দর্য হারাবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
বৈষম্যমুক্ত সংসদের দাবি
বক্তব্যের শুরুতেই স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনার ফ্লোর পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আমরা আশা করি, আপনি যখন কথা বলার সুযোগ দেবেন, সেখানে সরকারি দল বা বিরোধী দলের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবেন না। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা আপনার দায়িত্ব।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। সেই প্রস্তাবের ওপর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিলেও বিরোধী পক্ষকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। নাহিদ ইসলামের মতে, “সংক্ষিপ্ত সময় হলেও আমাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
দুই নির্বাচনের ম্যান্ডেট ও জুলাই সনদ
নাহিদ ইসলাম সংসদকে মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের ফসল নয়। তিনি বলেন, “আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজ এই মহান সংসদে এসেছি। একটি ছিল ঐতিহাসিক গণভোট এবং অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই পুরো প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি হলো ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে আদেশের ওপর ভিত্তি করে এই সংসদ দাঁড়িয়ে আছে, সেই গণভোটের আদেশকে এখন অমান্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো মহল থেকে এই আদেশকে ‘অসাংবিধানিক’ বলার ধৃষ্টতাও দেখানো হচ্ছে। অথচ এই গণরায়ের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের নতুন পথচলা শুরু হয়েছে।
সংস্কার বনাম সংশোধন: নতুন রাজনৈতিক দর্শন
সংবিধান নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “আমরা এখানে কেবল পুরোনো সংবিধানের কিছু ধারা উপধারা সংশোধন করতে আসিনি। আমরা এসেছি একটি পচে যাওয়া ব্যবস্থাকে আমূল সংস্কার করতে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্ত আমাদের সেই ম্যান্ডেট দিয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অবজ্ঞা করা হয়, তবে তা হবে সরাসরি জনরায়ের অবমাননা।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নাহিদ ইসলাম স্পিকার ও সংসদ নেতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদকে যেন কোনো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দর্পণে পরিণত করা হয়। সংবিধান সংস্কারের এই লড়াইয়ে বিরোধী দল পিছু হটবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

